‘ভালোবাসো…অন্তর হতে বিদ্বেষ-বিষ নাশো’

গদ্দার কুলের পোদ্দারের মুখে হঠাৎ এসব কথা! হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্বের সুর গদ্দার কুলের পোদ্দার ইদানীং তাঁর বাচনভঙ্গিতে ভালই রপ্ত করেছেন। কেন এই বিষ ছড়ানোর রাজনীতি? উত্তর খুঁজলেন সেখ জাহির আব্বাস

Must read

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) অভব্য আচরণের কারণে সাসপেন্ড হওয়া এবং তার পরবর্তীতে তাঁর যে কদর্য ভাষা সে নিয়েই দু চার কথা।
শুভেন্দুবাবু বিধানসভার বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে যে ভাষায় সরকার এবং একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত জাতিকে আক্রমণ করেছেন তা সত্যিই একজন দায়িত্ববান বিরোধী দলনেতা হিসেবে ভীষণই নিন্দাজনক। লজ্জারও। শিষ্টাচার বিরোধী।

এ বাংলা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের বাংলা। এ বাংলার মাটিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম। এ বাংলায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব, শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব। জাতি ধর্ম বর্ণ ভেদ সত্ত্বেও আমরা এক বাঙালি হিসেবে গর্বিত। প্রিয় দেশ যখন থেকে ভেদাভেদের রাজনীতির কবলে পড়েছে, তখন থেকেই বেশ কিছু স্থানে ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা আমরা দেখতে পেয়েছি। তবে তার জন্য বেশিরভাগটাই দায়ী এই ধরনের অনুদার রাজনীতিকরা। বাংলার বুকে যেখানে-যেখানে সমস্যা হয়েছে, আমরা দেখেছি সরকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু উসকানি দাতাদের তাতে মন ভরেনি। কারণ, তারা সব সময় চায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকা নয় বরং দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে কী করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা যায়। আর সেই সুযোগে ক্ষমতায় আসা যায়। আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে সোনারপুর— সর্বত্রই এ নজির দেখেছি। ইদানীংকালে শুভেন্দুবাবুর হাবভাবে যা বোঝা গেছে, তাতে অনেকের ধারণা যে, কোনও বক্তব্যে উনি মুসলিম-হিন্দু বা ধর্মীয় কোনও শব্দবন্ধ ব্যবহার ছাড়া পাঁচটি বাক্যও বলতে পারবেন না। হয়তো তাঁর বর্তমান দলে ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকতে গেলে এত সব কিছু এভাবে বলতেই হবে।

আর হ্যাঁ, ইদানীংকালে তাঁর কিছু ভুলও ভেঙেছে। যেমন উনি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ইত্যাদি নানারকম মানবিক প্রকল্পগুলোকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করে ‘ভিক্ষা’ পর্যন্ত বলেছেন, সেই তিনিই নাকি আবার বলতে শুরু করেছেন যে, আমরা ক্ষমতায় এলে এর থেকে বেশি গুণ বাড়িয়ে দেব। তাহলে এতদিন বিরোধিতার পরে এখন এই সমস্ত বলে গরিব, মধ্যবিত্ত জনগণের স্বার্থে যে প্রকল্পগুলি রয়েছে, পক্ষান্তরে সেগুলি স্বীকার করে নিচ্ছেন।
ঠিক এই একই কৌশলে তিনি আজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটা শ্রেণিকে যেভাবে লাগাতার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমান করে চলেছেন, তাতে একটা সময় তাঁর আবারও এরকম ভুল ভাঙবে। বুঝবেন, যে এদেরকে পাশে না নিলে বাংলায় অন্তত ক্ষমতায় আসা যাবে না।

তবে, তাঁর এই রণংদেহি রূপ, ভাষা এবং কদর্য ভঙ্গি দেখে বাংলার রুচিশীল সংস্কৃতিপ্রেমী শান্তিপ্রিয় মানুষজন ভিতরে ভিতরে অসন্তুষ্ট শুধু নয়,অস্বস্তিতেও পড়ছেন। উনি কি এভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে সত্যিই বাঙালি জনমানসে ফাটল ধরিয়ে দিতে পারবেন! মনে হয়, না। কারণ, বাঙালি সৌভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক বন্ধনের ভিত কিন্তু অনেক মজবুত।

আরও পড়ুন- আজ ইন্ডোর উপচে পড়বে তৃণমূলের সর্বস্তরের কর্মীদের উপস্থিতিতে, মেগা সভায় নেত্রীর দিকনির্দেশ

শুভেন্দুবাবু (Suvendu Adhikari) যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে ‘হিন্দু-বিরোধী সরকার’ তকমা দিয়ে তাঁর নিজের অভব্যতা ও ঔদ্ধত্যকে ঢাকার মরিয়া প্রয়াস চালালেন, তাতে পাশাপাশি বাস করা হিন্দু-মুসলমানের বাঙালি সমাজ স্তম্ভিত। বিরক্তও। উনি যেভাবে ভেদাভেদ এবং বিদ্বেষ-বিষ ছড়াচ্ছেন, তাতে বাংলার সুস্থ রুচিশীল মানুষ তাঁকে আরও বেশি উপেক্ষা করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। বিজেপিতে গিয়ে তাঁর এই ধরনের তীব্র ঘৃণা-ভাষণ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই। আর সামনেই আসছে বিধানসভা নির্বাচন। তবে উল্লেখ্য, তাঁর এখনকার মতো এত বিষ-মেশানো কদর্য ভেদ-ভাষা বিজেপি নেতাদের অনেকেই ব্যবহার করেন না।

শুভেন্দু কাকে ‘হিন্দু-বিরোধী-সরকার’ বলছেন! উনি কি জানেন না, এই সরকারের আমলেই কিন্তু দিঘায় জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে পুজোর মণ্ডপগুলোতে অনুদান, পুজো কার্নিভাল, পুরোহিতদের ভাতা প্রভৃতি চালু হয়েছে! উনি কি পরিসংখ্যান দেখে এটুকু বুঝতে পারেননি, বিধানসভায় থাকা ৬ ভাগের প্রায় ৫ ভাগ বিধায়কই অমুসলিম! তাছাড়া যে রাজ্যের সরকারি এবং সরকার পোষিত বিভিন্ন সংস্থা বা কমিটিতে ১০ ভাগের ৮ ভাগ সদস্য এবং তাদের অধিকাংশ প্রধান পরিচালকই অমুসলিম! তাহলে, সেই সরকার কীভাবে হিন্দু বিরোধী হতে পারে! এ সহজ সত্য কি আমজনতা বোঝে না! সুতরাং, উনি যে দৃষ্টি ঘোরাবার চেষ্টা করছেন এটাই স্বাভাবিক। কদিন আগে দেখলেন না, মাদ্রাসা নিয়ে তাঁর করা ‘জঙ্গি’ মন্তব্য! উনি ভেবেছিলেন এটা পাবলিক খুব খাবে হয়তো, কিন্তু যখন দেখলেন আরে বাবা, এ তো উল্টো হয়ে গেছে। মাদ্রাসায় বহু হিন্দু ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মী রয়েছেন। তখন তিনি স্বাভাবিক ভাবেই নীরব হয়ে গেলেন! এবারও হবেন ।
অনেকে আবার এ প্রশ্নও তুলছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেখানে যেখানে ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, তার পিছনে কোনও ইন্ধন নেই তো আবার! যা হয়ত এভাবেই রাজনীতিতে ব্যবহার করার সুবর্ণ সুযোগ হয়ে উঠবে । শুভেন্দু তো মাঝে মাঝেই বাংলাদেশ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। অথচ, এই বাংলাদেশ নিয়ে সর্বাগ্রে বাংলার সরকারে থাকা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীই প্রথম কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। এবং যেহেতু দেশের ব্যাপার, তাই দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি দেখার জন্য দাবি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, যেখানে শুভেন্দুবাবুর দলের শাসনক্ষমতায় থাকা দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি পর্যন্ত তেমন কিছু কড়া পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। হয়তো সেখানে দুটি দেশের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতাও অনেক ক্ষেত্রে বিচার্য। আর সেই জায়গা থেকেই দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এরূপ ভূমিকা হয়তো হতে পারে বলেই আমাদের অনুমান। অথচ উনি কিছুতেই এই সার সত্যটুকই বুঝবেন না। উনি যেন-তেন-প্রকারে বাংলাদেশ ইস্যুকে নিয়ে পশ্চিমবাংলায় উসকানিমূলক, বিভেদমূলক ভাষণ দিয়ে হাওয়া গরম করে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর ওপার বাংলার সব ব্যাপারকেই রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে এসে সরকারকে জড়িয়ে দেওয়ার এক অপরিণত মানসিকতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন, যা দুর্ভাগ্যজনক।
সুতরাং, তাঁর এসব কিছুই রাজনীতির বেড়াজালে সকলকে আচ্ছন্ন করার নির্মম প্রয়াস মাত্র। সুধী মননশীল মানুষ জেগে না উঠলে দেশ তথা সামাজিক কাঠামো বিপন্নতার মুখোমুখি হবে শীঘ্রই! কেউ ছাড়া পাব না তখন। চোখের সামনে হয়ত অনেক দুঃসহ বেদনাদায়ক ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। দেশপ্রেমিকদের রক্ত-ঘামেও কি ধর্ম খুঁজতে হবে এখন! নাম-বদলের রাজনীতিতে সত্যিই কি সত্য ইতিহাসকে মুছে দেওয়া যায়! রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দের বাংলা কি হেরে যাবে?
বিভেদ-বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে নিন্দা আর ঘৃণা ঝরে পড়ুক কলমের কালিতে! কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হোক প্রতিবাদ!

Latest article