Featured

টেলিকাইনেসিস

একবার ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন যে বাতাসের থেকেও দ্রুতগামী কী? উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন মন। মন এতটাই দ্রুতগামী যে সে কয়েক মুহূর্তে গোটা পৃথিবী ঘুরে আসার সামর্থ্য রাখে। তবে আজ আমরা মনের বেগ নয়, মনের শক্তি বা জোর নিয়ে কথা বলব। একজন খোঁড়া ব্যক্তিও মনে মনে পাহাড় ডিঙোতে পারে। কিন্তু কোনও মানুষ কি শুধুমাত্র মনের জোরেই সামনে রাখা বস্তুকে না ছুঁয়েই নাড়াতে পারে? আদৌ কি এটা সম্ভব? টেলিকাইনেসিস কি আদৌ সত্যি নাকি পুরোটাই মিথ।

মাইন্ড ওভার ম্যাটার
টেলিকাইনেসিস (telekinesis), যা সাধারণত সাইকোকাইনেসিস হিসেবে পরিচিত, সেখানে কোনওরকম শারীরিক যোগাযোগ ছাড়াই কেবলমাত্র নিজের মনের শক্তির সাহায্যে সামনে থাকা কোনও বস্তুকে সরানো যায়। অদ্ভুত এই কৌতূহলী ধারণাটি শতাব্দীকাল ধরে মানবকল্পনাকে মুগ্ধ করেছে, অগণিত কল্পকাহিনিকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তীব্র বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস জুড়ে টেলিকাইনেটিক ক্ষমতার অসংখ্য দাবিদার রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল ফ্রান্সের ‘ইলেক্ট্রিক গার্ল’ নামে পরিচিত অ্যাঞ্জেলিক কটিন। যিনি টেলিকাইনেটিক কার্যকলাপের একজন কথিত জনক ছিলেন। কটিন এবং তাঁর পরিবার দাবি করেছিলেন যে কটিন বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা তৈরি করে একটি ঘরের মধ্যে রাখা আসবাবপত্র না ছুঁয়েই কেবলমাত্র মনের জোরে এদিক-ওদিক করতে পারতেন। ফ্র্যাঙ্ক পডমোর লিখেছেন, এই ক্ষেত্রে এমন অনেকগুলি পর্যবেক্ষণ ছিল যা ‘প্রতারণার ইঙ্গিত’ দিয়েছিল যেমন মেয়েটির পোশাকের সঙ্গে সূক্ষ্ম যোগাযোগ ছিল নিক্ষিপ্ত বস্তুর, আর এই পোশাকের আন্দোলন কখনও হত নিক্ষিপ্ত বস্তুর দিকে বা কখনও হত তার থেকে একটু দূরে, কিন্তু আন্দোলনের মাত্রা এত দ্রুত ছিল যে তাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভবপর হয়নি।
২০ শতকের প্রথম দিকে পোলিশ মিডিয়াম স্ট্যানিস্লাওয়া টমসিক, তিনি ‘লিটল স্ট্যাসিয়া’ নামে একটি সত্তার মাধ্যমে টেলিকাইনেটিক লেভিটেশনের কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম বলে দাবি করেছিলেন। তাঁর একটি ১৯০৯-এর ফটোগ্রাফে, তাঁর হাতের মধ্যে একটি ‘ভাসমান কাঁচি’ দেখা যায়, প্রায়শই বই এবং অন্যান্য প্রকাশনাগুলিতে টেলিকাইনেসিস-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে এই ছবিটিকে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করেছিলেন যে টমসিক তাঁর হাতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সুতো বা চুল ব্যবহার করে তাঁর এই কীর্তি সম্পাদন করেছিলেন। এটি নিশ্চিত করা হয়েছিল যখন মানসিক গবেষকরা, যাঁরা টমসিককে পরীক্ষা করেছিলেন তাঁরা মাঝে মাঝে সেই সূক্ষ্ম সুতোটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

মনস্তত্ত্বের আলোকে
শীলা অস্ট্রান্ডার এবং লিন শ্রোডারের বেস্টসেলার সাইকিক ডিসকভারিজ বিহাইন্ড দ্য আয়রন কার্টেন প্রকাশের পর রাশিয়ান সাইকিক নিনা কুলাগিনা ব্যাপকভাবে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকের কথিত সোভিয়েত মনস্তাত্ত্বিককে দৃশ্যত দেখানো হয়েছিল টেলিকাইনেসিস করার সময় অসংখ্য সাদা-কালো ছোট ছোট ফিল্মে সেটিকে প্রদর্শিত হতে এবং ১৯৭৮ থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টেও এই একই কথা উল্লেখ করেছিল। জাদুকর এবং সন্দেহবাদীরা এটি যুক্তি দিয়েছিলেন যে কুলাগিনার কৃতিত্বগুলি সহজেই হাতের কৌশলে অনুশীলন করা বা সূক্ষ্ম সুতো, চৌম্বকীয় ধাতুর ছোট টুকরো বা আয়নার মাধ্যমে করা যেতে পারে।
জেমস হাইড্রিক, একজন আমেরিকান মার্শাল আর্ট বিশেষজ্ঞ এবং মনস্তাত্ত্বিক, তাঁর কথিত টেলিকাইনেটিক ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। মূলত বইয়ের পাতা ওল্টাতে এবং একটি ডেস্কের প্রান্তে রাখা অবস্থায় পেনসিল ঘোরানোর জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। পরে জাদুকরদের দ্বারা তাঁর কৃতিত্বের পিছনের কারসাজি প্রকাশিত হয়ে পড়ে, এটি দাবি করা হয় যে তিনি বায়ুর স্রোতের সাহায্যে তাঁর কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।

আরও পড়ুন- নন্দীগ্রামের নন্দীনাথ এখন নন্দী-ভৃঙ্গীর সঙ্গী

ধাতব বস্তু বাঁকানো
মনস্তাত্ত্বিকরা ধাতু বাঁকানোর টেলিকাইনেটিক ক্ষমতাও দাবি করেছেন। উরি গেলার টেলিকাইনেসিস দ্বারা তাঁর চামচ বাঁকানো ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এই কৌশলে বহুবার হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন তিনি। বিজ্ঞান লেখক টেরেন্স হাইন্সের মতে, গেলারের সমস্ত প্রভাব জাদুকরী কৌশল ব্যবহার করে করা হয়েছে।
ফরাসি সাইকিক জিন-পিয়ের জিরার্ড দাবি করেছেন যে তিনি টেলিকাইনেসিস দ্বারা ধাতব পাত বাঁকতে পারেন। ১৯৭০-এর দশকে তাঁকে পরীক্ষা করা হয়েছিল কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় কোনও অস্বাভাবিক প্রভাব তৈরি করতে তিনি ব্যর্থ হন। ১৯৭৭ সালের ১৯ জানুয়ারি, প্যারিসের একটি পরীক্ষাগারে পদার্থবিদ ইয়েস ফার্গ দ্বারা পরিচালিত দুই ঘণ্টার পরীক্ষা চলাকালীন জিরার্ড কোনও বস্তুকে অস্বাভাবিকভাবে সরাতে ব্যর্থ হন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৭ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর, পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের একটি পরীক্ষাগারে করা পরীক্ষায় ধাতু বাঁকানো বা ধাতুর গঠন পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হন। এসমস্ত ঘটনা দেখে সাক্ষীরা তাঁর কৃতিত্বকে জালিয়াতির তকমা দেয়। যদিও জিরার্ড পরে স্বীকার করেছেন যে তিনি কখনও কখনও জনসাধারণকে হতাশ না করার জন্য প্রতারণা করেছেন।

মিথের পিছনে বিজ্ঞান
যদিও টেলিকাইনেসিস প্যারানরমাল জগতের মধ্যে নিহিত, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান তার অস্তিত্বকে বৈধ করার চেষ্টা করেছে। অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে, কিন্তু কোনওটিই টেলিকাইনেসিসের বাস্তবতাকে সমর্থন করে এমন চূড়ান্ত প্রমাণ দেয়নি। টেলিকাইনেসিসের রিপোর্ট করা ঘটনাকে মনস্তাত্ত্বিক কারণ যেমন প্লাসিবো প্রভাব, ভুল ধারণা, বা সরাসরি প্রতারণার জন্য দায়ী করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেমন— থার্মোডায়নামিক্স, কনজারভেশন অফ মোমেন্টাম টেলিকাইনেসিসকে অনুমতি প্রদান করে না। কিছু আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য ভৌত জগৎকে প্রভাবিত করার জন্য মনের শক্তিতে বিশ্বাস করে, যদিও এই বিশ্বাসগুলি প্রায়শই অন্যান্য আধিভৌতিক ধারণার সঙ্গে জড়িত।

টেলিকাইনেসিসের (telekinesis) আবেদন
টেলিকাইনেসিস মিথ আর বিজ্ঞানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়ানো এক তথ্য তবে একে জানার আর মানার লোকের কিন্তু অভাব নেই। কারণ এটি মানবদেহের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করার এবং ব্যক্তিদের অসাধারণ ক্ষমতা প্রদানের সম্ভাবনার আশ্বাস দেয়, আর তাই-ই বোধ হয় এটি এত জনপ্রিয়।

Jago Bangla

Recent Posts

নিজের কেবিনে একাধিক মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, সাসপেন্ড পুলিশকর্তা

এক নয়, একাধিক! নিজের দফতরে মহিলাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর শাস্তি পেলেন সেই পুলিশ আধিকারিক। কর্নাটক…

1 hour ago

রাজ্যে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…

2 hours ago

সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…

2 hours ago

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

2 hours ago

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…

2 hours ago

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…

2 hours ago