সবচেয়ে পাতলা সোনার পাত

এতদিন গ্রাফাইট থেকে তৈরি করা গিয়েছিল এক পরমাণু-সমান পুরু কার্বন-পাত, নাম তার গ্রাফিন। এবার তৈরি হয়েছে সোনার তৈরি সবচেয়ে পাতলা পাত, অনেকদিনের চেষ্টায়। সেই পাতের বিবরণ লিখলেন অর্পণ পাল

Must read

ছোটবেলার বইয়ে আমরা কার্বন পরমাণুর কথা জেনেছিলাম। কার্বন এমন এক মৌল, যা দিয়ে তৈরি হয় অজস্র পদার্থ। দামি স্বচ্ছ এক শক্ত বস্তু হীরে থেকে শুরু করে গ্রাফাইট, কয়লা, ন্যাপথালিন, পেট্রোলিয়াম, ভেসলিন বা প্রাণীর হাড়— সর্বত্রই কার্বনের উপস্থিতি। আবার জৈব যৌগ, যা কিনা যাবতীয় প্রাণী বা উদ্ভিদের দেহের মুখ্য উপাদান, সেসবের পেছনেও আছে কার্বনের অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি।
এই কার্বন দিয়ে তৈরি বস্তুর ধর্ম নিয়ে বহুকাল আগে থেকেই গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কৃত ‘গ্রাফিন’ সেই তালিকারই এক নবতম সংযোজন। গ্রাফিন হল অত্যন্ত পাতলা কার্বনের এক স্তর, যার পুরুত্ব এতটাই কম যে দেখা গিয়েছে এদের পুরুত্ব আমাদের চুলের এক হাজার ভাগের এক ভাগ মাত্র। গ্রাফাইটের সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের পরিচয় রয়েছে। পেনসিলের যে কালচে ধূসর শিস খাতায় দাগ ফেলে, ওটাই গ্রাফাইট। আর এই গ্রাফাইটই গ্রাফিনের প্রধান উপাদান। অত্যন্ত হালকা আর শক্ত এই অধাতব পাত দিয়ে বহু ধরনের কাজ করানো যায়। তাছাড়া গ্রাফিনের আরও একটা বড় গুণ, এর তাপ আর তড়িৎ পরিবাহিতা খুব বেশি। গ্রাফিন দিয়ে যে ব্যাটারি তৈরি করা হয়, তার আয়ু অন্য ব্যাটারির চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি। তাছাড়া হালকা হওয়ার জন্য ড্রোন জাতীয় যন্ত্রের ব্যাটারিতে গ্রাফিন ব্যবহার করলে দারুণ সুবিধে পাওয়া যায়। এখানেই শেষ নয়, গ্রাফিন খুবই স্বচ্ছ আর নমনীয়, যে-কারণে বিভিন্ন ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতির আবরণ হিসেবে গ্রাফিন কাজে লাগানো হয়। শুধু তাই নয়, গ্রাফিন দিয়ে জল-শোধনের কাজ বা কম্পিউটারের সার্কিটকে আরও বেশি সূক্ষ্ম বানিয়ে তোলার কাজে এই গ্রাফিনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও অনেক প্রয়োগ আছে এর, সব এখানে বলা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন-পথশ্রী প্রকল্পে চা-বাগান এলাকা পেল নতুন রাস্তা

গ্রাফিন আবিষ্কারের কথা
বেশ কয়েক দশক ধরেই দ্বিমাত্রিক পাত নিয়ে গবেষণা চললেও এই জিনিস প্রথম বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন মাত্রই বছর একুশ আগে, ২০০৪ সালে। সেবছর ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক আন্দ্রে গেইম (Andre Geim) আর কনস্টানটিন নভোসেলভ (Konstantin Novoselov) কার্বনের এক রূপভেদ গ্রাফাইট দিয়ে মৌচাকের মতো ষড়ভুজাকৃতি এই অত্যন্ত পাতলা পাত জাতীয় জিনিসটি তৈরি করেন। ওরই নাম দেওয়া হয় ‘গ্রাফিন’ (Graphene)। এই ধরনের পাতকে দ্বিমাত্রিক বলা হচ্ছে কারণ এই পাত এতটাই পাতলা যে এর তৃতীয় মাত্রা বলে কিছু নেই, এক-একটা পাত মাত্রই একটা পরমাণুর সমান দৈর্ঘ্য-বিশিষ্ট। ওই আবিষ্কার পরে ২০১০ সালে ওই বিজ্ঞানীদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়েই আরও সাম্প্রতিককালে তৈরি হয়েছে দ্বিমাত্রিক কেলাস বা ক্রিস্ট্যাল, যাদের নাম হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড, টাংস্টেন ডাই সালফাইড, মলিবডেনাম ডাইসালফাইড, এরকম বেশ কিছু পদার্থ। এদের গঠন আর ধর্মে ফারাক থাকলেও মূল বৈশিষ্ট্য এক, তা হল এরা প্রত্যেকেই এক পরমাণুর দৈর্ঘ্য-বিশিষ্ট। বা অন্যভাবে বললে এদের পুরুত্ব মাত্রই একটা পরমাণুর যা দৈর্ঘ্য, সেইটুকুই।
ওই আবিষ্কারের ঠিক কুড়ি বছর পর, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ‘গোল্ডিন’ আবিষ্কারের খবর সামনে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা এই ‘সোনার পাত’ তৈরির কৃতিত্ব সুইডেনের এক দল গবেষকের। দেখা যায় যে সোনা ধাতুটি তড়িতের সুপরিবাহী হলেও এই গোল্ডিন মোটেই সেরকম সুপরিবাহী নয়।

কী কাজে লাগতে পারে এই ‘গোল্ডিন’?
গ্রাফিনের চেয়েও উন্নত আর আধুনিক এই গোল্ডিন দিয়ে আগামী দিনে ঘটানো যেতে পারে যুগান্তর। এই বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে যখন বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়েই চলেছে, তখন এই গোল্ডিনের সাহায্যে সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সাহায্যে তৈরি করা যাবে ইথানল বা মিথেনের মতো জ্বালানি! ফলে কমবে চিরাচরিত জ্বালানির ব্যবহার আর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও। শুধু তাই নয়, জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন বের করে সেই হাইড্রোজেন থেকেও জ্বালানি তৈরির কাজটাও সেরে নেওয়া যাবে এই গোল্ডিন দিয়ে। দূষণবিহীন জ্বালানির খোঁজে যে নিরন্তর গবেষণায় ডুবে আছেন বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেখানে এই ধরনের আবিষ্কার যে কতটা আশাপ্রদ, তা আশা করা যায় সহজেই, বোঝা যায়।
এছাড়াও ইলেক্ট্রনিকস ক্ষেত্রেও ঘটবে যুগান্তর। অত্যন্ত ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরির ক্ষেত্রে এই গোল্ডিনের ব্যবহার দারুণ সুবিধে দেবে, যেহেতু এই পদার্থ তড়িতের অর্ধপরিবাহী (মানে এদের পরিবহন ক্ষমতা ধাতুর চেয়ে কম, অধাতুর চেয়ে বেশি)। পত্রিকায় প্রকাশিত পেপারে এই পদার্থ তৈরির বিভিন্ন ধাপ সম্বন্ধে বিবরণ দেওয়া আছে বটে, তবে সে-জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাদের ঢোকবার সাধ্য নেই। সুইডেনের লিঙ্কোপিং (Linkoping) বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষকদল যে সত্যিই এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা আমরা বুঝতেই পারছি। আগামী দিনে এঁদের হাতে নোবেল পুরস্কারের মতো কোনও স্বীকৃতি জুটবে কি না, তা এক্ষুনি বলা হয়তো সম্ভব নয়, তবে তা পেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

Latest article