মিথ্যার জমিদারদের নির্যাতন কমিশন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি সব পারে! চাকরি, কর্মসংস্থানের মাথায় বেত্রাঘাতের সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে নিতে পারে বৈধ ভোটারকেও অবলীলায়। এই মুহূর্তে বাংলার বিভিন্ন স্কুল কলেজ ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখলে ভোটার বাদ দেওয়ার নামে সেই হেনস্তা ও অত্যাচারের টুকরো টুকরো ছবিই সামনে আসছে প্রতিনিয়ত। এসআইআর পর্যবসিত হয়েছে ভোটার অধিকার কাড়ার নির্মম উৎসবে! বাংলার নাগরিক ইতিহাস কোনও নির্বাচনের আগে নির্বাচকদের নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা দেখেনি। লিখছেন চন্দ্রিমা পাঠক

Must read

বিজেপির অঙ্গুলি হেলনে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR), অর্থাৎ ‘সার’কে অসার একটি প্রক্রিয়া করে ছাড়ল সংঘী জ্ঞানেশকুমারের নির্বাচন কমিশন। জানুয়ারি ২০২৬-এর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী বেশ বুঝতে পারছেন, এসআইআর (SIR) একটি থ্রি-ডি (3D) প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এর ত্রিবিধ পরিণতি ‘দ্য ডিলিটেড’ (অর্থাৎ, অপনীত), দ্য ডাউটফুল (অর্থাৎ সংশয়জনক) এবং দ্য ডিসেনফ্রাঞ্চাইজড (অর্থাৎ ভোটাধিকার বঞ্চিত) নাগরিকের সৃষ্টি। প্রথম দফায় খসড়া ভোটার তালিকা থেক ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের অনুপস্থিত, স্থানান্তারিত, মৃত ও ভুয়ো হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এরকম সব জীবিকা সংক্রান্ত ও বাসস্থানগত সমস্যার কারণে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। কলকাতা বন্দর এলাকায় এভাবেই ২.২৮ লক্ষ ভোটদাতার মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশের নাম বাদ পড়েছে। সবর ইনস্টিটিউটের সমীক্ষার ফলে প্রকাশ, এই অঞ্চলে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের অধিকাংশের (১৬.২ শতাংশের) পদবি ‘সিং’। তারপরেই বাদ যাওয়া নামের (৮.৪১ শতাংশ) পদবি ‘খাতুন’।

উত্তর ২৪ পরগনায় অবস্থিত চটকল এলাকায় ভোটারদের বেশির ভাগই পরিযায়ী শ্রমিক। এসব এলাকার বুথগুলিতে বাদ যাওয়া নামের সংখ্যা বেশি। এখানকার ভোটারদের নাম কী হারে বাদ পড়েছে, সেটা বোঝার জন্য দুটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। মেঘনা জুটমিল সংলগ্ন এলাকার বুথে ৭০৪ জন ভোটারের নাম কাটা পড়েছে। অ্যাল্যায়েন্স জুটমিল ক্যান্টিন বুথে বাদ পড়েছে ৬৭৭ জন ভোটারের নাম।

‘সার’ (SIR) কার্যকর করার ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী ছিল বিজেপি। তারাই অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মুসলমান ভোটাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। ‘সার’ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের ভারত থেকে তাড়াবে, এই প্রচারের প্রকোপ দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু প্রথম দফায় ‘সার’-শেষে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে কলকাতায়, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নয়। মহানগরীর ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৬.০৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাদ পড়েছে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রে, শতাংশের বিচারে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা মোট তালিকাভুক্ত ভোটারের ৩৬.৮৫ শতাংশ। এই বিধানসভার অন্তর্গত ৪২ নং ওয়ার্ডে শ্রী জৈন শ্বেতাম্বর তেরাপন্থী বিদ্যালয়ের বুথে নথিভুক্ত ভোটারদের মধ্যে ৭১৮ জন ভোটারের নাম কাটা গিয়েছে। এদের মধ্যে ১৫.৯১ শতাংশের পদবি ‘দাস’। ১১.৮৮ শতাংশের পদবি ‘সিং’। ৬.৩৩ শতাংশের পদবি ‘শর্মা’। ৫.০৭ শতাংশের পদবি ‘গুপ্তা’। ‘দাস’ ছাড়া বাকি তিনটি পদবিই কিন্তু অবাঙালি হিন্দু ভোটারদের। মুসলমান ভোটারের নয়।

সবর ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় প্রকাশ, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলায় ১৫টি মতুয়া অধ্যুষিত বিধানসভার প্রত্যেকটিতে গড়ে ৩৩.৯৫ শতাংশ নথিভুক্ত ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে ‘স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন’, এই কারণ দেখিয়ে। আর এই ১৫টি বিধানসভার প্রত্যেকটিতে গড়ে ২১.৫১ শতাংশ ভোটারকে ‘অনুপস্থিত’ দেখানো হয়েছে।

আর এই মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় গেলেই দেখা যাবে, বাসিন্দাদের আলোচনার একমাত্র বিষয় হল ‘সার’-এর শুনানির ‘সমন’। গোবরডাঙার ১১ নং ওয়ার্ডের মতো বেশির ভাগ ওয়ার্ডেই যাঁরা শুনানির ডাক পেয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নেই। তাঁরা কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। এঁদের বেশিরভাগই গত শতাব্দীর আটের দশকে ওপার বাংলা থেকে এপারে এসেছেন। গাছের তলায় কাটিয়েছেন বহু রাত্রি। নথি বলতে সম্বল বাড়ির দলিল, খসড়া তালিকায় নিজের নাম খুঁজে না-পেয়ে এরকম মানুষজন আতঙ্কিত।

আরও পড়ুন-হাফ ম্যারাথন দিয়ে ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ কর্মসূচির সূচনা কলকাতায়

আবার গত শতাব্দীর সাতের দশকের মাঝামাঝি থেকে ভারতে আছেন; ১৯৭৫-এ তাঁদের বাবা-মা ভোট দিয়েছেন; ২০০২-এর ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম ছিল; এখন খসড়া তালিকায় গোটা পরিবারের নাম উধাও। ওদিকে শুনানি কেন্দ্র প্রায় ১৫ কিমি দূরে। এঁরাও আতঙ্কিত। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
এরকম মানুষদের আতঙ্ক বৃদ্ধির কারণ অনেকটাই অবশ্য শান্তনু ঠাকুর। তাঁর বক্তব্য, ৫০ লক্ষ রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলমানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য এক লক্ষ মতুয়া না-হয় কিছুদিনের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেন না, তাতে ক্ষতি কী!

এই মন্তব্যের ফলে যে ক্ষতি মতুয়া মহল্লায় হয়েছে, সেই ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য এখন শান্তনু মরিয়া। মতুয়া সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে ছুটছেন রাষ্ট্রপতির কাছে। কিন্তু যে সত্যিটা মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়েছে, সেটাতে যে পরিমাণ আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তা মোছা যাচ্ছে না কিছুতেই। মতুয়ারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেনই, এমন কথা বুক ফুলিয়ে বলতে পারছেন না, বলাতে পারছেন না কেন্দ্রের শাসক দলের কোনও ওজনদার সর্বভারতীয় নেতাকে দিয়ে। ভয় যাচ্ছে না কিছুতেই।

বিতর্ক এড়াতে নানা রকম নতুন নতুন নির্দেশিকা জারি করে চলেছে নির্বাচন কমিশন। আর বিজেপি ফাটা রেকর্ডের মতো বলে চলেছে, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, ভুয়ো আর মৃতদের তালিকা থেকে বাদ দিতে চাইলে ‘সার’-এর কোনও বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে সার সংশোধিত ভোটার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে বাদ পড়া, সন্দেহজনক আর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলা নাগরিকদের নিয়ে ল্যাজে-গোবরে। ত্রুটিহীন ভোটার তালিকা ক্রমশ নির্বাচন কমিশনের এলেমের বাইরে চলে যাচ্ছে। সারের সারকথা অসার নিষ্ফল প্রয়াস হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এক ব্যর্থ পরিহাস হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভোটার তালিকায় সংশোধনের বিশেষ উৎসব।

Latest article