সম্পাদকীয়

পেরিয়ে এলাম বিদ্বেষ বিষের বর্ষ, এখনও আচ্ছে দিন সুদূরপরাহত

মনে থাকবে ফেলে আসা বছরের টুকরো টুকরো ছবিগুলো।
২০২৫-এর বড়দিনের ছোট ছোট ঘটনাবলি।
অসমের নলবাড়ির স্কুলে বজরং দলের ধ্বজাধারী ‘গুন্ডা’দের ভাঙচুর।
ছত্তিশগড়ের রায়পুরে শপিং মলে ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ক্রিসমাসের সজ্জা ভেঙে তাণ্ডব।
খাস দিল্লিতে সান্তাক্লজের টুপি পরায় রাস্তার মধ্যে মহিলাদের হেনস্থা।
দেশের নানা প্রান্তে এভাবে গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডব চলল, অথচ প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিল না! বরং পরোক্ষে প্রশ্রয় দিল!
উল্লিখিত কোনওটাই কাঙ্ক্ষিত ছবি নয়। কোনওটাই সুস্থ বাতাবরণের বার্তা নয়।
অথচ এটাই হল নতুন ভারতের নয়া বৈচিত্র্য। এখানে ঐক্যের কোনও জায়গা নেই। এবং এটাই নাকি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আদর্শ ছবি।
অথচ একজন ব্যক্তি, যিনি এই শহর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আরএসএস ভূমিষ্ঠ হওয়ারও ৩২ বছর আগে, তিনি পাড়ার গলির মোড়ে কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায় নয়, একেবারে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোন মতবাদ অথবা বদ্ধমূল ধারণায় বিশ্বাস করার চেষ্টাতেই হিন্দুধর্ম নিহিত নয়; অপরোক্ষানুভূতিই উহার মূলমন্ত্র; শুধু বিশ্বাস করা নয়, আদর্শস্বরূপ হইয়া যাওয়াই— উহা জীবনে পরিণত করাই ধর্ম।’
সেই বাঙালি সন্ন্যাসী ব্যক্তিত্বকে বিশ্ব চেনে স্বামী বিবেকানন্দ বলে।
এসব কথার মানে বোঝেন ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে জোড় হাত করে নাটক করা অমিত শাহ? কিংবা তাঁর চ্যালা-চামুণ্ডার দল, যাঁরা কথায় কথায় ‘জয় শ্রীরাম’ আওয়াজ তোলে এবং ঠেলায় পড়লে ডাকাতিয়া কেতায় ‘জয় মা কালী’ স্লোগান দেয়!
এতই যাদের হিন্দুপ্রেম তারা বলুক, রাষ্ট্র নীতির কোন তত্ত্বের প্রণোদনায় তারা ওই বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসীদের ভারতীয়ত্ব নিয়ে ঘোঁট পাকায়, যার জেরে রামকৃষ্ণ মিশনের যেসব মহারাজ ৫০ বছর ধরে মিশনে আছেন, তাঁদেরকে এসআইআর-এর হিয়ারিংয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে নথি দেখাতে হয় আর হিয়ারিং শেষে আক্ষেপ করতে হয়, ‘সাধুদের না ডাকলেই ভাল হত’?
আরে ও নরেন মোদি! ও অমিত শাহ! ও কাঁথির খোকা কুভেন্দু! ও অবলাকান্ত হাফ প্যান্ট (কু) শিক্ষামন্ত্রী! আপনারা বিবেকানন্দ পড়েছেন? তাঁর বাণী জেনেছেন? হিন্দু কাকে বলে, সেটা বুঝেছেন?
জানেন আপনারা, হিন্দুর বেদ ব্যক্তিতে নয়, সমষ্টিতে বিশ্বাসী! আর আপনাদের পরম নেতা নরেন মোদি কেবল আমিত্বে বিশ্বাসী। এই ভারতে যা ভাল হয়েছে, সব তিনিই করেছেন। সব পরিষেবা তিনি দিয়েছেন। ভারতকে জগৎসভায় তিনিই নিয়ে গিয়েছেন। কাজেই স্বামীজি ঠিক কী বলে গিয়েছেন, বেদে কী লেখা রয়েছে… এসবে গা করার প্রয়োজন নেই তাঁর।
দুর্গা অঙ্গন নিয়ে ফেরেপ্পাবাজির অবস্থান আপনাদের। সংবিধানের কথা তুলে টিভিতে গোদি মিডিয়া প্রযোজিত সান্ধ্য বৈঠক গরম করার চেষ্টা?
অতই যদি সংবিধাননিষ্ঠ আপনারা, তবে বলুন, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার পর ১২টি ডবল ইঞ্জিন রাজ্য ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন পাশ করিয়েছে কীভাবে?
সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারা এদেশের মানুষকে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এখানে কোনও ব্যক্তি তো দূরঅস্থ্, রাষ্ট্রও হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাও গেরুয়া তাণ্ডব চলছে কীভাবে, রাজ্যে রাজ্যে? সেই সেই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে প্রশাসন হামলাকারীদের নয়, দায় চাপাচ্ছে উৎসবে যাঁরা অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের উপর। কোন সাংবিধানিক বিচারে?
স্কুলে হামলা হল, গির্জাতেও।
সঙ্গে বাইবেল রাখলেও ‘গুন্ডাতন্ত্র’ মনে করল, এই তো ধর্মান্তরণের ছক ছিল।
জন্মদিনের পার্টির আয়োজন করলে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল ছেলেমেয়েদের। কেন?
এই দুঃশাসনের দালাল শুভেন্দু, সুকান্ত, আপনারা যদি এতই বঙ্গ ও বাঙালিপ্রেমী, তবে বলুন, মুসলিম, অনুপ্রবেশ, সন্ত্রাসবাদ— তিনটি প্রসঙ্গকে পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে দেশবাসীর কাছে উপস্থিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ময়দানে নেমেছেন কেন?
কেন বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই ভিন রাজ্যে হেনস্তা হতে হচ্ছে বাঙালিকে?
একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বাংলাভাষী মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করেছে স্থানীয়রা, এমনকী পুলিশও। কেন?
বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ বা বৈধ অভিবাসী, হিন্দু হোক বা মুসলিম, আইনি পরিচয়পত্র থাকুক বা না-থাকুক, ভারতীয় হোক বা জাল পরিচয়পত্র-সহ বাংলাদেশি, বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক হোক বা বাংলাদেশি শ্রমিক— বাংলাভাষী মানেই ‘বহিরাগত’। কিন্তু এই ভাষা সন্ত্রাসের শেষ কোথায়?
এমন এক ভারত তৈরি করেছে এ নোংরা লোকগুলো, যেখানে স্রেফ সন্দেহের বশে সংখ্যালঘু মানুষকে জেলে পোরা যায়, অত্যাচার করা যায়, মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়া যায়, এমনকী চাইলে জোর করে সীমান্তের ওপারেও ছুঁড়ে দেওয়া যায়। আর তাঁদের থাকার জায়গায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া, ঘরদোর ভেঙে দেওয়া তো বুলডোজাররাজের যুগে জলভাত।
দেশের নাগরিক কি না তা ভাল করে যাচাই করারও দরকার নেই, রাষ্ট্রের দেওয়া নানা কিসিমের পরিচয়পত্রকে বিশ্বাস করতেও পুলিশের বয়ে গিয়েছে।
বাংলাভাষী শ্রমিক হলেই অনুপ্রবেশকারী বলে খেয়াল খুশিমতো এমন নিপীড়ন চালাতে পারে রাষ্ট্র। অপরাধ প্রমাণ করার দরকার পড়ে না, সন্দেহ হলেই হল।
স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পেরিয়ে এমনই এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রের মুখোমুখি আমরা।
এই অবস্থার প্রতিরোধের একটাই উপায়।
আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে একটি ভোটও দেবেন না। ওদের রাজনৈতিক ভাবে খতম করুন।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন থেকে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি-মুক্ত ভারত তৈরির শক্ত ভিত নির্মাণ করুন।
নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়॥

আরও পড়ুন-বছরের প্রথম দিনেই দিঘার জগন্নাথধামে, প্রায় দুই লক্ষ পর্যটক ও ভক্তের ঢল নামল

Jago Bangla

Recent Posts

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

7 minutes ago

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…

12 minutes ago

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…

21 minutes ago

স্মৃতিদের পাঁচে পাঁচ

বরোদা, ১৯ জানুয়ারি : ডব্লুপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর স্বপ্নের দৌড় অব্যাহত। সোমবার গুজরাট জায়ান্টসকে ৬১…

57 minutes ago

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

1 hour ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

2 hours ago