চল্লিশের দুঃসাহসী কবিতা
উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার এই মেয়েটি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই নিজের বাড়ি ছেড়ে জীবন-জীবিকার খোঁজে পাড়ি দিয়েছিল মুম্বই। সেখানেই মিডিয়া ও কর্পোরেট সেক্টরে নিজের কেরিয়ার গড়ে তুলে এর পাশাপাশি সে ভীষণভাবে শরীরচর্চা করতে ভালবাসত যাকে ওই ফিটনেস ফ্রিক বলে আর কী! এই পর্যন্ত গল্পটা চেনাশোনা আর পাঁচটা মেয়ের মতো হলেও কবিতা চন্দ কিন্তু শুধু ফিটনেস ফ্রিক হিসেবে নিজেকে আটকে রাখেননি বরং অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ ভিনসন জয় করে ভারতের পর্বতারোহীদের তালিকায় নিজের নাম তুলে ফেলেছেন। স্থানীয় সময় (২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ) রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ৪,৮৯২ মিটার উঁচু পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছন তিনি। ৪০ বছর বয়সি এই পর্বতারোহীর এটাই প্রথম নয় এর আগে ইউরোপের মাউন্ট এলব্রুসও তিনি জয় করেছিলেন। তবে অ্যান্টার্কটিকার এই সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করার পরে উত্তরাখণ্ড-সহ সারা দেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন কবিতা।
আরও পড়ুন-প্রচণ্ড ঠান্ডায় গৃহহীনদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করুন : দিল্লি হাইকোর্ট
ফিটনেস ফ্রিক কবিতা পর্বতারোহী হওয়ার সঙ্গে একজন সফল অ্যাথলিট। তিনি দিল্লি এবং মুম্বই হাইরক্স ২০২৫ ইভেন্টে জিতেছেন এবং অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরস সিক্স স্টার চ্যালেঞ্জের তিনটি রেসেও অংশ নিয়েছেন। কবিতা ২০২৪ সালে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তাঁর কর্পোরেট পেশাকে টাটা বাই-বাই করে দিয়ে তার প্যাশনকে আরও বেশি করে প্রাধান্য দিতে থাকেন, তিনি মনে করেন তাঁর এই সিদ্ধান্তই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
বিখ্যাত হাই-অ্যাল্টিটিউড গাইড মিংমা ডেভিড শেরপার নেতৃত্বে কবিতার এই অভিযান সফল হয়েছে। এ ছাড়াও, কবিতাকে নানা রকমভাবে সাহায্য করেন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ভরত থামিনেনি এবং তাঁর সংস্থা ‘বুটস অ্যান্ড ক্র্যাম্পন’। তাঁদের নেতৃত্বে মোট ন’জন ভারতীয় পর্বতারোহীর একটি দল সফলভাবে মাউন্ট ভিনসনের শীর্ষে পৌঁছন।
মাউন্ট ভিনসন বিশ্বের অন্যতম দুর্গম পর্বত। এই পর্বতশৃঙ্গের অবস্থান, হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা এবং অ্যান্টার্কটিকার শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে প্রতি মুহূর্তে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন পর্বতারোহীরা। কবিতার এই অভিযান শুরু হয়েছিল ৩ ডিসেম্বর, ভারত থেকে। ৪ ডিসেম্বর তিনি চিলির পুনটা আরেনাস পৌঁছন এবং ৭ ডিসেম্বর ইউনিয়ন গ্লেসিয়ারে যান। এর পর তিনি এক বিশেষ বিমানে করে ২১০০ মিটার উচ্চতায় থাকা ভিনসন বেস ক্যাম্পে পৌঁছন। মাউন্ট ভিনসন জয় আসলে কবিতার সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ (Seven Summits) জয়ের লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বা মাইলফলক তা বলাইবাহুল্য।
আন্টার্কটিকার তুষারশুভ্র প্রান্তরে ভারতের তিরঙ্গা উত্তোলন করতে পেরে ৪০ বছরের কবিতা প্রমাণ করে দিয়েছেন চরম দুঃসাহসিক কাজে, দুর্গম প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি মেয়ে আত্মবিশ্বাসের জোরে জয়লাভ করে, শুধু তাই নয় স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে কর্মরত পেশাদাররা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন যেকোনও বয়সে,বয়স কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে আদৌ কোনও বাধা নয়। কথায় আছে না? বয়স কেবলমাত্র সংখ্যা তা যেন সত্যিই কবিতা প্রমাণ করে দিলেন!
আরও পড়ুন-ট্রাম্পকে রাজি করাল সৌদি, কাতার ও ওমান
কনিষ্ঠতম অভিযাত্রী কাম্যা
শুধু কবিতা নয় কবিতার মতো আরও একজনের যিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত স্কি করে (Youngest Indian to Ski) পৌঁছে ভারতের কনিষ্ঠতম অভিযাত্রী হিসেবে নজির গড়েছেন। তিনি কাম্যা কার্তিকেয়ন। একদিকে ৪০, অন্যদিকে ১৮— কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই বয়স বাধা হয়ে উঠতে পারেনি।
তুষারঝড়ের দাপট, হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকা তাপমাত্রা, ঝোড়ো হাওয়ার প্রাবল্য— কিছুই অষ্টাদশী কাম্যাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে এবং এক ইতিহাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। নৌবাহিনীর এক আধিকারিক কম্যান্ডার এস কার্তিকেয়নের এই ১৮ বছরের কন্যা কাম্যা শুধু ভারতের কনিষ্ঠতম ব্যক্তি হিসেবেই দক্ষিণ মেরুতে স্কি করে পৌঁছননি, একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম মহিলা হিসেবেও এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
এই ঐতিহাসিক অভিযানের দিন ছিল ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫। প্রায় -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যেও কাম্যা প্রায় ৬০ নটিক্যাল মাইল যা প্রায় ১১৫ কিলোমিটার-এর সমান সেই পথ হেঁটে অতিক্রম করেছেন। নিজের সম্পূর্ণ অভিযানের সরঞ্জাম বোঝাই স্লেজ টেনে নিয়ে তিনি ৮৯ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৌঁছন।
কাম্যা মুম্বইয়ের নেভি চিল্ডরেন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী। ছোট থেকেই পাহাড়ে চড়ার নেশা তার প্রবল। বাবা কমান্ডার এস কার্তিকেয়ন নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিক। বাবার থেকেই কাম্যা পাহাড়ে চড়ার নেশা পেয়েছেন। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, মাত্র ১৬ বছরে এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিল কাম্যা তখন সে নেভি স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। এত অল্প বয়সে এর আগে কোনও ভারতীয় কিশোরী এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেনি। বাবার সঙ্গেই এভারেস্টও জয় করেছেন কাম্যা। ২০২৪ সালের ২০ মে বাপ-বেটি জুটি শৃঙ্গ জয় করেন। এর সাথে সাথে কাম্যা ‘সেভেন সামিটস চ্যালেঞ্জ’ সম্পূর্ণ করেছেন, যার মধ্যে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমাঞ্জেরো (৫৮৯৫ মিটার), ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুস (৫৬৪২ মিটার) ও অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট কোসিউসজকো (২২২৮ মিটার) রয়েছে। শৃঙ্গ জয়ের কৃতিত্বের জন্য ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বাল পুরস্কার পেয়েছেন কাম্যা।
মুম্বইয়ের বাসিন্দা এই তরুণ পর্বতারোহীর এখন লক্ষ্য হল ‘এক্সপ্লোরার্স গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ সম্পূর্ণ করার। এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ এবং উত্তর ও দক্ষিণ— দু’টি মেরুতেই স্কি করে পৌঁছোন। তিনি খুব শীঘ্রই এই অভীষ্ট লক্ষ্যও পূরণ করবেন তা বলাই যায়, ওই যে, একটা কথা আছে না? ‘মর্নিং shows the ডে’! যে-মেয়ের ঝুলিতে ইতিমধ্যেই এতো সাফল্য সে যে তাঁর আগামী লক্ষ্য ও পূরণ করবে তা বলাইবাহুল্য। কাম্যার এই অসাধারণ সাফল্য তাঁর প্রজন্মের বহু তরুণ-তরুণীকে নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার, নতুন কিছু করার জন্য অনুপ্রেরণা দেবে।
আরও পড়ুন-শ্রেয়াঙ্কার পাঁচ, এখনও অপরাজিত স্মৃতির দল
উলতাফ বানো এক লড়াইয়ের নাম
কাশ্মীরের শীত মানেই শুধু সাদা তুষারের সৌন্দর্য নয়— এখানে শীত মানে বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতা আর লড়াই। যখন চারপাশে পাঁচ-ছয় ফুট বরফ জমে যায়, রাস্তাঘাট হারিয়ে যায় সাদা ‘অন্ধকারে’, তখন অনেক গ্রাম কার্যত মানচিত্রের বাইরে চলে যায়। ঠিক সেই সময়, এক নারী প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন। হাতে পার্সেল, পায়ে ভারী বুট, গায়ে ফেরান।
তিনি কোনও সেনা নন, কোনও অভিযাত্রীও নন। তিনি একজন পোস্টওম্যান। নাম— উলফাতা বানো।
হিরপোরা হল এমন এক জায়গা যেখানে শীত মানে পরীক্ষা। দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার হিরপোরা গ্রাম। শ্রীনগর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চরম শীতের কবলে পড়ে। তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। তুষারপাত এতটাই ঘন হয় যে, রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, যানবাহন তো অনেক দূরের কথা, সাধারন মানুষের যাতায়াত ও হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। বিদ্যুৎ, জল, যাতায়াত— সবই অনিশ্চিত। কৃষিকাজ বন্ধ থাকে, মানুষ নির্ভর করে আগাম সঞ্চিত খাদ্যের উপর। পাইপে জল জমে যায় বরফ হয়ে, তাই অনেককে তুষার গলিয়ে বা দূরের ঝরনা থেকে জল আনতে হয়। এই প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেই প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন উলফাতা বানো।
এ যেন এক নারীর একার নীরব লড়াই।
৫৫ বছর বয়সি উলফাতা বানো গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হিরপোরার পোস্টওম্যানের কাজ করে। যখন তুষারপাত তিন থেকে চার ফুট, কখনও বা তারও বেশি— তখনও তিনি হাঁটেন। কোনও সরকারি গাড়ি নেই, নেই বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা। তবুও তিনি পৌঁছে দেন চিঠি, পরীক্ষার ফর্ম, বই, ওষুধ আর অপেক্ষার শেষ চিহ্ন—পার্সেল।
‘অনেক সময় এমন হয়, তুষারের জন্য কিছু পরিবার পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন আমাকে কয়েক কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হয়’ এমনটাই বলেন উলফাতা। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ভারী পার্সেল— এই ছবিটাই হিরপোরার মানুষের কাছে সবচেয়ে পরিচিত।
দিনে ২০-২৫টি বা তারও বেশি পার্সেল পৌঁছে দেন তিনি। উলফাতা মাসে প্রায় ২২ হাজার টাকা আয় করেন। তিনি হিরপোরা পোস্ট অফিসে একজন পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করেন। জেলা পোস্ট অফিস থেকে ডাক এনে গ্রামে বিতরণ করা তাঁর দায়িত্ব। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫টি চিঠি ও পার্সেল পৌঁছে দেন তিনি। অনেক পার্সেলই ভারী— এই বয়সে যা নিঃসন্দেহে শারীরিক চ্যালেঞ্জ।
‘মাঝে মাঝে আমার ছেলে আমাকে গাড়িতে করে কিছু দূর এগিয়ে দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাকে হেঁটেই যেতে হয়’ তিনি হাসিমুখে বলেন। এই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের কষ্ট আর অভ্যেসে পরিণত হওয়া সংগ্রাম।
এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে হাঁটাই তাঁকে জীবনে চলতে শিখিয়েছে। উলফাতা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছেন, কিন্তু কখনও গাড়ি চালানো শেখেননি। তাই পরিবহণের জন্য তিনি প্রায়শই নিজের পায়ের উপরই ভরসা রাখেন। তাঁর কাজ শারীরিকভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমের, তবুও তিনি এর মধ্যে খুঁজে পান এক মানসিক শান্তি। যা তার কাঁজের পথকে করে তুলেছে আরও মসৃণ।
‘প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হাঁটা আমাকে সুস্থ রাখে। কষ্ট তো আছেই, কিন্তু দায়িত্বের জন্য সেই কষ্ট পার করতেই হয়’ বলেন তিনি।
এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে এক নারীর দৃঢ় মানসিকতা— যেখানে অভিযোগ নেই, আছে গ্রহণ, আছে কর্তব্যবোধ, আছে মানসিক শান্তি।
আরও পড়ুন-স্থায়ী উপাচার্য মিটছে সমস্যা
নিঃসন্দেহে উলফাতা তার পরিবারের গর্ব
উলফাতার স্বামী, মোহাম্মদ শফি শাহ, নিজেও একজন প্রাক্তন পোস্টম্যান। স্ত্রীর কাজ নিয়ে তাঁর গর্ব চোখে পড়ার মতো। ‘শীতকালে তার কাজ সবচেয়ে কঠিন। তরুণরাও যেখানে হাঁটতে ভয় পায়, সেখানে সে তিন-চার ফুট তুষারের উপর দিয়ে হেঁটে যায়। কখনও এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে পার্সেল। তবুও সে থামে না’ বলেন তিনি।
পরিবার জানে— প্রবল তুষারপাত মানেই দুশ্চিন্তা। তবুও উলফাতা বেরিয়ে পড়েন, কারণ কেউ তাঁর অপেক্ষায় আছে।
ঘন তুষারের আড়ালে রয়েছে আরও ভয়ানক বিপদ
হিরপোরা গ্রামটি একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কাছাকাছি। শীতকালে পাহাড়ে খাবার কমে গেলে চিতাবাঘ ও ভালুক গ্রামে নেমে আসে।
‘উপরের এলাকা তুষারে ঢাকা পড়ে গেলে বন্যপ্রাণীরা মানুষের কাছাকাছি চলে আসে’ বলেন শাহ। যদিও উলফাতা কখনও সরাসরি বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হননি, তবুও প্রতিবার বাইরে বেরোনোর সময় পরিবারের দুশ্চিন্তা থেকেই যায়।
উলফাতা হয়ে উঠেছে হিরপোরার প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীদের ভরসা। হিরপোরার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে উলফাতা বানো শুধুই পোস্টওম্যান নন— তিনি শিক্ষার পথ খুলে রাখা একজন নীরব সহযোদ্ধা।
কলেজ ছাত্র ও প্রশাসনিক পরিষেবার প্রার্থী শহিদ আহমেদ বলেন, ‘প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও তিনি বই আর পড়াশোনার সামগ্রী পৌঁছে দেন। তাঁর জন্যই আমরা পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারি।’
এই কথাগুলোই উলফাতার পরিশ্রমকে অর্থবহ করে তোলে।
যখন ৫৫ বছর বয়সি এই উলফাতাকে জিজ্ঞেস করা হয় ৩০ বছর ধরে কী তাঁকে এগিয়ে রাখে?
এই প্রশ্নের উত্তর উলফাতা খুব সহজভাবে দেন।
‘আমার কর্তব্যবোধ আর যাঁদের উপর আমি দায়িত্বে আছি, তাঁদের হাসিই আমাকে এগিয়ে রাখে। আমি জানি, আমার কাজের জন্য কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, কেউ প্রিয়জনের খবর পায়। এই অনুভূতিই সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।’
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনের দর্শন।
তিনি শুধুই এক পোস্ট উইমেন নয়, তাঁর দায়িত্ব তাঁকে বানিয়ে তুলেছে একটি সেতুতে। তুষার, ঠান্ডা আর দীর্ঘ পথ— কিছুই উলফাতা বানোর সংকল্পকে থামাতে পারেনি। হিরপোরার মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মী নন। তিনি একটি সেতু— যে সেতু গ্রামকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত রাখে। যে সেতু দিয়ে আসে খবর, আশা আর মানবিক উষ্ণতা। যতদিন পা চলবে, ততদিন উলফাতা হাঁটবেন। তুষারের বুক চিরে, হাতে চিঠি আর পার্সেল নিয়ে। কারণ কিছু নারীর গল্প শুধু শোনা নয়— অনুপ্রেরণা হয়ে
থেকে যায়।

