ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কুৎসা-অপপ্রচার ও অসভ্যতাকে সংগঠন বিস্তারের হাতিয়ার বলে মনে করে এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন একের পর এক বাংলার সামাজিক উন্নয়ন এবং বাংলার নারীদের ক্ষমতায়নের চিত্র তুলে ধরছিলেন, ঠিক তখন পাঁচ থেকে ছয় জন এসএফআই কর্মী বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে যে অসভ্যতার নজির সৃষ্টি করল তাকে নিন্দা জানানোর ভাষা বাংলা অভিধানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলার প্রিয় মুখ্যমন্ত্রীকে অপদস্ত করতে গিয়ে তারা পক্ষান্তরে এই বাংলাকে ছোট করার চেষ্টা করলেন। আসলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির কোনওদিনই এই দেশ-এর প্রতি আবেগ বা ভালবাসা ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে নির্দ্বিধায় ব্রিটিশের সহযোগী হয়ে শুধু ওঠেনি, অভিভক্ত সিপিআই-এর মুখপত্র “গণযুদ্ধ”-এর মাধ্যমে তারা নেতাজির বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে বিশেষণমূলক উপাধি ছুড়েছিল, তাঁকে গোয়েবলসের দ্বারা ধরে রাখা একজন অভিশাপ, জাপানি জেনারেল তোজোর দৌড়বিদ কুকুর, জাপানি সাম্রাজ্যবাদী রাক্ষসের মুখোশ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
১৯ জুলাই, ১৯৪২। গণযুদ্ধর প্রথম পৃষ্ঠায় নেতাজিকে নিয়ে প্রকাশিত হয় এস জি সার্দেশাইয়ের একটি অন্তত আপত্তিকর কার্টুন যেখানে নেতাজিকে “Subhas Bose as the donkey carrying Tojo” বা তোজো বহনকারী গাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষেও কমিউনিস্ট পার্টি তার কুৎসা-অপপ্রচারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল। ছয় দশকের শেষের দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী অতুল্য ঘোষ যিনি একটি চোখ হারিয়েছিলেন পুলিশের লাঠির আঘাতে, তাঁকেও আক্রমণ করতে ছাড়েনি কমিউনিস্ট পার্টি। সেদিন কমিউনিস্ট পার্টির দেওয়াল লিখনে ছিল— “মাছের শত্রু কচুরিপানা / দেশের শত্রু অতুল্য কানা।” অতুল্য ঘোষকে আক্রমণ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার লক্ষ্য নিয়ে সে-সময়ে বহু নিন্দা-কুৎসার জন্ম দিয়েছিল কমিউনিস্ট দলগুলি। “কারও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে খোঁটা দিয়ে ছড়া কেটে প্রচার করাটা নিশ্চই খুব উঁচুদরের সংস্কৃতির পরিচয় ছিল না। বিশেষ করে সেই প্রতিবন্ধকতা যখন দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধের পুরস্কার হিসেবে অতুল্য ঘোষ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়কার বামপন্থীরা এইসব কথা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি।” এ মন্তব্য করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত চৌধুরী। এমনকী বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন-কেও কুৎসার আঘাতে বিদ্ধ করেছিল কমিউনিস্টরা। দলীয় প্রচারের জোরে তদানীন্তন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীকে স্টিফেন হাউসের মালিক বানিয়ে দেওয়া হল। অথচ সেই প্রফুল্লচন্দ্র সেন রাজনীতি-উত্তর জীবনে একটি ছোট ফ্ল্যাটে কালাতিপাত করেছেন। ১৯৮৪ সালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাস্ত করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এই অশীতিপর বৃদ্ধের অতি সাধারণ ও দরিদ্র জীবনযাপন।
আজও আমরা দেখলাম যখন গত ২৭ মার্চ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজের সেমিনারে বিশেষ আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বাংলার নবরূপকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরছিলেন বাংলার সামাজিক উন্নয়ন-এর কথা, জানাচ্ছিলেন বাংলার নারীদের ক্ষমতায়নের কথা, শোনাচ্ছিলেন বাংলার মা-বোনেদের ছোট ছোট ইচ্ছাপূরণের গল্প, যখন সারা বিশ্ব তন্ময় হয়ে শুনছিল একটি দশ কোটির বেশি জনসংখ্যা সম্বলিত রাজ্যের সামাজিক পরিবর্তন, শিশু ও নারীর কল্যাণ কীভাবে ঘটিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; ঠিক তখনই গুটিকয়েক এসএফআই কর্মী বিজেপিকে সাঙ্গে নিয়ে সেই সভাকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অপদস্ত করার মধ্যে দিয়ে অশালীনতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করল তাতে স্তম্ভিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। কারও বুঝতে অসুবিধে হল না বামপন্থীরা আছে অসভ্যতাতেই। আলিমুদ্দিনের নির্দেশে এসএফআই-এর সুচিন্তন দাসদের এই শিষ্টাচারহীন আচরণের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হল যে বামপন্থীদের অসভ্যতার ধারিবাহিকতা বর্তমান এসএফআই বহন করে চলেছে। এস ওয়াজিদ আলির ভাষায়— ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলিতেছে।’
কেলগ কলেজে সিপিএম-বিজেপি এই যে বিশৃঙ্খলা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল তার আগাম খবর দিদির কাছে ছিল না তা নয়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে তাতে বিচলিত হবেন না এটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি বহু লড়াই-আন্দোলনের মধ্য থেকে জননেত্রী হয়ে উঠেছেন। আর তাঁর প্রতিটি লড়াই ছিল নিপীড়িত-বঞ্চিত অসহায় মানুষের জন্য। সিপিএম-এর করাল গ্রাস থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করার যে লড়াই তিনি দিয়েছেন তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাতে নিজেও রক্তাক্ত হয়েছেন বারবার। সেই রক্ত মিশেছিল কলকাতার রাজপথে, গঙ্গার জল চুঁয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সমগ্র বাংলায়। জন্ম দিয়েছিল হাজারটা মিছিলের। দিদি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মুক্তি-সূর্য।
আরও পড়ুন- জাভি-কাঁটায় বিদ্ধ মোহনবাগান