সম্পাদকীয়

এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই জিতবে বাংলাই

রাজনীতির ময়দানে বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোট আসলে একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে পুরাতন মালদহের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
বিজেপি আর কংগ্রেস, দুই দলের নেতৃত্ব সমঝোতা করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। কংগ্রেসের সমর্থনে পঞ্চায়েত সমিতি চালাচ্ছে বিজেপি বোর্ড। সমিতির সভাপতি বিজেপির। অন্যদিকে, মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েতেও একই অবস্থা। সেখানে বিজেপির সমর্থনে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেসের বোর্ড। প্রধান রয়েছেন কংগ্রেসের।

আরও পড়ুন-গদ্দারকে পাল্টা তোপ দাগল তৃণমূল কংগ্রেস

পুরাতন মালদহে পঞ্চায়েত সমিতির আসন ১৮টি। সেখানে বিজেপি আট, কংগ্রেসের দুই, সিপিএম একটি আসন পায়। তৃণমূল পেয়েছিল সাতটি। অন্যদিকে, মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েতে ২৫টি আসনের মধ্যে তৃণমূল এবং কংগ্রেস ন’টি করে আসন পায়, বিজেপি পাঁচ এবং দুটিতে নির্দল প্রার্থী জিতেছিলেন। পরবর্তীতে বিজেপি এবং কংগ্রেস সমঝোতা করে বোর্ড চালাচ্ছে। বিজেপি একটি আপাদমস্তক বাংলা বিরোধী দল। বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে বর্ধমানের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
ভিনরাজ্য থেকে আসা বিজেপি নেতারা সে জেলায় থাকছেন নামী হোটেল ভাড়া করে। তাঁদের জন্য রয়েছে এলাহি বন্দোবস্ত। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র ঘুরে ভোট ব্যাঙ্ক তৈরি করা নাকি তাঁদের টার্গেট। অথচ, তাঁরা বাংলা বলতে জানেন না। বোঝেনও না। সেক্ষেত্রে দোভাষীর প্রয়োজন হচ্ছে। ভিনরাজ্য থেকে থেকে আসা নেতারা গ্রামে গিয়ে ভোজপুরী, হিন্দি ভাষায় বুলি আওড়াচ্ছেন। অনেকেই কিছু না বুঝে মাথা নাড়াচ্ছেন। অন্য রাজ্যের ভোট যে কায়দায় হয়, বাংলায় সে কায়দায় ভোট করানোর জন্য ওইসব নেতাদের আমদানি করা হয়েছে। এটা কার্যত বাংলার মানুষের প্রতি, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি অপমান।
আর একদিকে এত মাখামাখি ঢলাঢলি, অন্যদিকে অবাঙালি নেতাদের দিয়ে ভোট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, সবটাই একটা গোটা ছকের দুটো অংশ। একটা মূল ষড়যন্ত্রের দুটো ডানা।
মূল ষড়যন্ত্রটা হল ভোটার তালিকায় ঘাপলা করার ধান্দা। মুখ্য ষড়যন্ত্রী সংঘী জ্ঞানেশ ,কুমার ওরফে ভ্যানিশ কুমার।
হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণ আর মোদি-অমিত শাহের আসা যাওয়ার বাইরে বঙ্গ বিজেপি এখনও স্বনির্ভর হতেই পারল না। বুথে বসা লোকের তালিকা আছে, কিন্তু ভোটের দিন অধিকাংশের টিকি মেলে না। সেজন্যই শুভেন্দু-সুকান্তর মস্তিষ্কপ্রসূত দাওয়াই এসআরআই।
এবার এসআইআর পর্বেও বিএলএ’দের গালভরা লম্বা তালিকা দিতে বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্করা কার্পণ্য করেননি। সংখ্যার নিরিখে তা যথেষ্ট হলেও, বাস্তবে ওইসব বিএলএ-র দেখা কি মিলেছে প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার সর্বত্র? কলকাতা শহরের আশপাশে? মানুষের অভিজ্ঞতা করুণ! সেজন্যই সব দায়িত্ব এখন ভ্যানিশ কুমারের কাঁধে।

আরও পড়ুন-১৯-এ আসছেন অভিষেক, প্রস্তুতি সভা উত্তর দমদমে

কিন্তু তাতে কী হল!
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বঙ্গ দখলের ইচ্ছে আছে ষোল আনা ছেড়ে আঠারো আনা। পাশে বাম- কংদের টানার জন্য অগুনতি টাকা আছে। সর্বোপরি, বশংবদ নির্বাচন কমিশন আছে। তবু এসআইআরে লাভের বদলে দলের পুরো অভিযানটাই পুরো ফ্লপ হতে বসেছে। সেটা বুঝেই গেরুয়া গোয়ালে এখন ত্রাহি-ত্রাহি রব।
রোহিঙ্গা দূরস্থ্, পেটে লাথি পড়েছে মতুয়া হিন্দুদেরই। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সঙ্গে এমন বেইমানি আর কোন রাজনৈতিক দল করেছে! সেজন্যই কেন্দ্রের বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব ছেড়ে দিয়ে বেয়াক্কেলের মতো অনুপ্রবেশকে প্রধান ইস্যু করার খোয়াব দেখেন। ভুলে যান, এ হল, লুডোর বোর্ড উল্টে চিৎ হয়ে আকাশের দিকে থুতু ছোড়ার শামিল! তাঁর মন্ত্রকের ব্যর্থতার সাতকাহনের উপর দাঁড়িয়ে বাংলায় ভোট লড়বে গেরুয়া শক্তি? এই পরিচিত নাটকের শেষ অঙ্কে ‘শাজাহান’ মার্কা ট্র্যাজিক পরিণতিটা সবার জানা। সীমান্ত পেরোনো এত ঘুসপেটিও ঢোকাল কে? অমিতজির বিএসএফএর ব্যর্থতা।
২০২১-এ যেমন দু’শো আসনে জেতার খোয়াব মিলিয়ে গিয়েছিল, থামতে হয়েছিল একশোরও আগে, দল ভেঙে এজেন্সি নামিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণের বন্যা বইয়েও একশো আসনও জেতা হয়ন, সেই ক্লান্তিকর একঘেয়ে ন্যারেটিভ হাজির করে এবারও কি বিশেষ লাভ হবে? কী হবে, সেটা বাংলার মানুষ আর কয়েক মাস পরে ঠিক করবে। আবার জিতবে বাংলা।
কারণ, এখনই বোঝা যাচ্ছে, অমিত শাহের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তাই কলকাতা সফরকালে তিনি বলেছেন, কেন্দ্রের এজেন্সি স্বাধীনভাবে কাজ করে, তাঁর দল বা সরকারের কথায় চলে না। এটাই নিঃসন্দেহে শতাব্দীর সেরা জোক। নতুন বছরের পদার্পণের মুহূর্তে এর চেয়ে বড় ন্যাকামি বলুন, ধ্যাষ্টামি বলুন, আর কিছু আছে! এমন সার্কাসের মধ্যে আর কী দেখছি আমরা?

আরও পড়ুন-বাংলাদেশের দাবি নিয়ে ধীরে চলো আইসিসির

কনকনে ঠান্ডা। সঙ্গে উত্তুরে হাওয়া। পারদ নামছে। যাদের রক্ত টগবগ করে ফোটার কথা, সেই তরুণদেরও হাঁটু কাঁপছে। বয়স্কদের অবস্থা আরও কাহিল। এই পরিস্থিতিতে ‘বেনাগরিক’ হওয়ার ভয়ে কাগজপত্র বগলদাবা করে বিডিও অফিসে লাইন দিয়েছেন সরকার গড়ার কারিগররা। তাঁদের কারও শরীরে স্যালাইনের সুচ, কারও নাকে গোঁজা অক্সিজেনের নল। অনেকে তীর্থের কাকের মতো ডাকের আশায় শুয়ে আছেন অ্যাম্বুলেন্সে। নির্বাচন কমিশনের খাতায় তাঁরা সকলেই ‘সন্দেহজনক’ নাগরিক। রাজ্যের প্রতিটি বিডিও অফিসে একই ছবি। ফিরল নোটবন্দির দুর্দশার স্মৃতি। অনেকের মতে, এসআইআর হয়রানি নোটবন্দির চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ এবার ধনী, নির্ধন সবাইকেই লাইনে দাঁড় করিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে, সামনে কমিশন থাকলেও পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বিজেপি। এঁরা প্রত্যেকেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পেটের ভাত জোগাড় করেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ৫০০ ও হাজার টাকার নোট বাতিলের দিনেও এই মানুষগুলিকে দুশ্চিন্তা ছুঁতে পারেনি। কারণ নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে পাঁচশো, হাজার টাকার নোট থাকার কথা নয়। ছিলও না। তাই লাইন দিতে হয়নি। কিন্তু, এসআইআর শুরু হতেই তাঁদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব খোয়ানোর ভয় চেপে বসেছে। তাই কমিশনের নোটিশ পেয়ে রুটিরুজি ফেলে ছুটে এসেছেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে। এরপরেও তাঁরা ভোটাধিকার পাবেন, নাগরিক হবেন, এমন গ্যারান্টি নেই। সবটাই নির্ভর করছে কমিশনের উপর। কর্তারা যদি ‘নট স্যাটিসফায়েড’ লিখে দেন তাহলে সব চেষ্টাই বৃথা।
এসআইআর শুনানি যত এগোচ্ছে মানুষের ক্ষোভ ততই চড়ছে। তাঁরা বুথে বুথে বিজেপিকে মুছে ফেলার জন্য তৈরি হচ্ছেন।
আর ওদিকে বিজেপি কমিশনের প্রতিটি অমানবিক কাজের দানবিক সাফাই দিচ্ছে। সুকান্ত বলছে, তাঁর বাবার কথা। শুভেন্দু বলছে, এসআইআর-এর কারণে মানুষ মরার মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। দুজনের একই সুর, বঙ্গেশ্বর জ্যোতি বসুর স্টাইলে, এমনটা তো হয়েই থাকে।
আমরা, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বাংলার মানুষ বলছি, অবিলম্বে এই নরনিধন কর্মসূচি বন্ধ করা হোক।

Jago Bangla

Recent Posts

স্মৃতিদের পাঁচে পাঁচ

বরোদা, ১৯ জানুয়ারি : ডব্লুপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর স্বপ্নের দৌড় অব্যাহত। সোমবার গুজরাট জায়ান্টসকে ৬১…

34 minutes ago

দিনের কবিতা

‘জাগোবাংলা’য় (Jago Bangla) শুরু হয়েছে নতুন সিরিজ— ‘দিনের কবিতা’ (poem of the day)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের…

42 minutes ago

মঙ্গলবার ডায়মন্ড হারবারে সেবাশ্রয়-২ পরিদর্শনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের ছোট ছোট অসুবিধাগুলিকে দূর করে তাদের জীবন সহজ করা। সেবার মধ্যে দিয়ে কঠিন বাধা…

1 hour ago

সত্যিই আসন্ন মোদির বিদায়বেলা? বয়স নিয়ে খোঁচা গড়করির

নাগপুর : এবারে কি সত্যিই ঘনিয়ে এল মোদির বিদায়বেলা? দলের অন্দর থেকেই সুস্পষ্ট বার্তা, অনেক…

11 hours ago

জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, কিশতওয়ারে শহিদ জওয়ান

শ্রীনগর : সেনাবাহিনীর (Indian Army) সঙ্গে কিশতওয়ারের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল…

11 hours ago

ট্রাম্পের শুল্কতোপের মুখেও অনড় ইউরোপের ঐক্য, পাল্টা পরিকল্পনা

ওয়াশিংটন: ইউরোপের দেশগুলির উপর শুল্কের ভার চাপিয়ে গ্রিনল্যান্ড (Greenland_America) দখল করার কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট…

11 hours ago