থাইরয়েড সচেতনতায়

পান থেকে চুন খসলেই রেগে যাচ্ছেন। বিশ্রাম নিচ্ছেন তাও ক্লান্তি যাচ্ছে না। চুল উঠছে খুব। অবহেলা করবেন না। এর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে অসুখের ইঙ্গিত। চিকিৎসকেরা বলছেন, থাইরয়েডের লক্ষণ শুরুতে বোঝা যায় না। তাই শরীরে ছোটখাটো বদল হলেই সতর্ক হোন। লিখছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

জানুয়ারি হল থাইরয়েড-সচেতনতা মাস। এটা এমন এক রোগ যা বাড়লে যে-কেউ চলে যেতে পারেন ভীষণ ডিপ্রেশনে। থাইরয়েড ডিজর্ডার এবং তা থেকে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে, এই রোগের বিভিন্ন লক্ষণ বা উপসর্গ সম্পর্কে ধারণা দিতে এবং দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয় সুস্পষ্ট করতে প্রতিবছর জানুয়ারিতে পালিত হয় থাইরয়েড-সচেতনতা মাস। থাইরয়েড রোগী শুধু শারীরিক নয় অনেক মানসিক সমস্যারও শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’র মতে, ভারতে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ৩৭ জনের থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে। ১৯২৩ সালে আমেরিকান থাইরয়েড অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয় এবং এর কার্যাবলি শুরু হয়েছিল জানুয়ারি মাসে। পরবর্তীতে পৃথিবী জুড়ে জানুয়ারিতেই পালিত হতে শুরু করে থাইরয়েড-সচেতনতা মাস।

আরও পড়ুন-আইএসএল শুরু ১৪ ফেব্রুয়ারি

থাইরয়েড কী
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নাম ‘কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজ়ম’। এটা জন্মগত রোগও। আবার অনেকের এই রোগ পরেও ধরা পড়ে। এই সমস্যার জেরে ভুগতে হয় আজীবন। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক না হওয়ায় শারীরিক বা মানসিক বৃদ্ধি পিছিয়ে পড়ে। থাইরয়েড হল গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতি-আকৃতির মতো একটি গ্রন্থি, যা T3 এবং T4 হরমোন তৈরি করে এবং শরীরের শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোন কোনও ক্ষেত্রে তৈরি হয় না বা অতিরিক্ত তৈরি হয়। দুটো ক্ষেত্রেই সেটা থাইরয়েড। আবার সাধারণত থাইরয়েড গ্রন্থি থাকে গলায়। কিন্তু যাঁদের থাইরয়েড গ্রন্থি জিভের তলায় বা অন্য অংশে থাকে, তাঁরাও এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। শরীরে আয়োডিনের অভাব ঘটলেও থাইরয়েড হয় কারণ আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে সাহায্য করে।
যেক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি যথেষ্ট হরমোন তৈরি করতে পারে না তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। যেক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত পরিমাণে তৈরি করে তাকে হাইপার-থাইরয়েডিজম বলে।
নবজাতকের থাইরয়েড
শিশুদেরও থাইরয়েড হয় তবে তার বেশিটাই বংশানুক্রমিক। সন্তানধারণের পরেই অর্থাৎ ভ্রূণ অবস্থাতেই এই গ্রন্থি তৈরির কাজ শুরু হয়। অনেক শিশুর শরীরে জন্ম থেকেই থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দেয়। বহু শিশুর আবার থাইরয়েড গ্রন্থি পরিণত হয় না।
কী করে বুঝবেন
হাইপোথাইরয়েডের সমস্যা থাকলে জন্মের পর শিশুর জন্ডিসের সমস্যা দেখা দেয়। এই বাচ্চার ওজন হঠাৎ খুব বেড়ে গেলে সতর্ক হতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে। দেখা গেল শিশুটি হয়তো খুব ঘুমোচ্ছে এবং মোটেই খেতে চাইছে না।
অনেক সময়ে জ্বর না থাকলেও শিশুর শরীরে কাঁপুনি দেখা যায়। পেশি সক্ষম হয় না।
থাইরয়েডের সাধারণ লক্ষণ
হাইপোথাইরয়েডিজম
সারাদিন খালি ঘুম পায়। যেখানে শুয়ে পড়েন ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমিয়েও শরীরে ক্লান্তি যাচ্ছে না। ওজন বাড়ছে। মনে কেমন যেন সারাক্ষণ মানসিক চাপ। ঠান্ডা সহ্য করতে পারছেন না। ত্বক খুব শুষ্ক, খসখসে ও হঠাৎ চুল পড়া শুরু হয়েছে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটা যেন বাড়াবাড়ি। কোনও কাজে মন বসে না। মনোযোগের অভাব ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস। পেশি ও গাঁটে ব্যথা। মুখ ও পা ফোলা-ফোলা— তাহলে হতেও পারে আপনি হাইপোথাইরডিজমে ভুগছেন।

আরও পড়ুন-বীরভূমে ১১তে ১১ টার্গেট: রামপুরহাটে দাঁড়িয়ে বিজেপি নেতাদের কীর্তি ফাঁস অভিষেকের

হাইপারথাইরয়েডিজম
ওজন কমে যাচ্ছে হঠাৎ অথচ খিদে রয়েছে! অতিরিক্ত ঘামেন এমনকী শীতেও খুব গরম লেগে যাচ্ছে।
বুক ধড়ফড় করে মাঝেমধ্যে ও অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, হাত কাঁপে, এক উদ্বেগ কাজ করছে, বিরক্তি ও ঘুমের সমস্যা, গলগণ্ড (ঘাড়ে থাইরয়েড ফুলে যাওয়া), চোখ জ্বালা করে— তা হলে হতেও পারে হাইপারথাইরয়েড। এ-ছাড়াও শরীরে একটা জলজমার প্রবণতাও থাকে থাইরয়েডে। দুটো ক্ষেত্রেই উপসর্গ বুঝে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।
মহিলাদের ক্ষেত্রে
মহিলাদের অনিয়মিত ঋতুস্রাবের নেপথ্য-কারণ হতে পারে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যাওয়া। ওজন বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া, চুল ওঠা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব— এগুলি একসঙ্গে হলে একেবারেই সময় নষ্ট না করে থাইরয়েডের মাত্রা পরীক্ষা করান।
রক্তপরীক্ষা
থাইরয়েড টেস্টের প্রথম ধাপটাই হল রক্তপরীক্ষা। টিএসএইচ (TSH)
থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন টেস্ট।
পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এই হরমোন থাইরয়েডকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এর কম-বেশি দুটোতেই থাইরয়েডকে নির্দেশ করে।

টি-৪ এবং টি-৩
রক্তে এই দুটো থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ মাপা হয়। রয়েছে
অ্যান্টিবডি পরীক্ষা যেটা কিছু অটোইমিউন থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে। এ-ছাড়া রয়েছে থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড, থাইরয়েড স্ক্যান ইত্যাদি।
চিকিৎসা
থাইরয়েড নিজে থেকে কমবে না। খুব কম সাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে ওষুধ না খেয়ে দেখা যেতে পারে কিছুদিন। থাইরয়েড রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি, মেডিকেশন মূলত চিকিৎসা। ওষুধ খাবার নিয়ম রয়েছে। এর সঙ্গে খাওয়াদাওয়া নিয়ম মেনে করলে থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে থাকে। আয়োডিন থেরাপি রয়েছে। হাইপারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড কোষ ধংস করতে এই চিকিৎসা করা হয়। আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক (সামুদ্রিক খাবার, বাদাম, বীজ)-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

Latest article