ধ্যান আর প্রণামমন্ত্র অনুসারে দেবী সরস্বতী শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মাসনা,
শ্বেতবস্ত্রাবৃতা, দ্বিভুজা, হংসারূঢ়া রূপে পূজিতা, তিনি বেদ, বেদাঙ্গ বেদান্ত তথা সকল জ্ঞানের আধার। বিভিন্ন পুরাণে মায়ে বিচিত্ররূপের বর্ণনা রয়েছে। ঋগ্বেদে বাগদেবীর তিনটে মূর্তির কথা বলা হয়েছে। ভুলোকে ইলা, অন্তরীক্ষে সরস্বতী এবং স্বর্গলোকে ভারতী। শিবপুরাণে সরস্বতী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, চতুর্ভুজা, ত্রিনয়না,
চন্দ্রকলাশোভিতা, বর ও অভয়মুদ্রা শোভিতহস্তা, শ্বেতপদ্মে উপবিষ্ঠা, নীলকুঞ্জিত কেশশোভিতা। গড়ুরপুরাণে দেবী আটপ্রকার শ্রদ্ধা, ঋষি, কলা, সেবা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও মতি। তন্ত্রশাস্ত্রে এই আটটি শক্তি হলেন যোগা, সত্যা, বিমলা, জ্ঞানা, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা। বায়ুপুরাণে দেবী চতুর্ভূজা, হংসারূঢ়া, বামদিকে দু-হাতে জপের মালা,বরমুদ্রা। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবী চতুর্ভুজা, পীতবসনা, নানা অলঙ্কারে অলঙ্কৃতা। শেষ হবে না দেবীর নানা রূপকল্প কিন্তু এই বাংলার ঘরে ঘরে তিনি ‘জয় জয় দেবি চরাচরসারে কুচযুগশোভিতমুক্তাহারে। বীণাপুস্তকরঞ্জিতহস্তে, ভগবতি ভারতি দেবি নমস্তে’
আসলে আমাদের সরস্বতী বিদ্যেবতী, সঙ্গীতজ্ঞা, বীণা বাজাতে পটু, সুন্দরী তাই তাঁর ভারি দর, বিশ্বব্যাপী কদর। শুধু পুরাণ ভাগবতেই তিনি সীমাবদ্ধ নন এই বাংলায় মহাকবি কালিদাসের সরস্বতী, নীল সরস্বতী যেমন বিখ্যাত তেমনই বিখ্যাত রাজস্থানের পুষ্করের সরস্বতী আবার তিব্বতের সরস্বতী ইয়েং চেন মারও কদর কিছু কম নয়। এই জনপ্রিয়তা যুগে যুগে অক্ষত।
বঙ্গের বীণাপাণি
মহাকবির সরস্বতী
নানুরের বেলুটি গ্রামের প্রাচীন সরস্বতী। কথিত আছে এখানেই কালিদাস মা সরস্বতীর বরে মহাকবি হয়েছিলেন। আগে এখানে দেবীর শিলামূর্তি ছিল। ছিল এক প্রাচীন মন্দির। আর মন্দিরের পাশে ছিল এক সরোবর। জনশ্রুতি অনুযায়ী নিজের মূর্খতা ও অজ্ঞতার দুঃখে কালিদাস যখন এই সরোবরে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তখন মা সরস্বতী তাঁকে দর্শন দিয়ে সমস্ত বিদ্যায় সিদ্ধিলাভের বর প্রদান করেন। পাঠান আমলে কালাপাহাড় এই অঞ্চল আক্রমণ করে সেই মন্দির ধ্বংস করেন। মা সরস্বতীর মূর্তি ছয় খণ্ড করে সরোবরে ফেলে দেন। এরপর বর্গি হাঙ্গামার সময় আবার আক্রান্ত হয় এই অঞ্চল। দীর্ঘদিন জলের তলায় থাকার পর গ্রামবাসীদের চেষ্টায় মায়ের ওই খণ্ডিত শিলা উদ্ধার করা হয়। অতীতের সেই সরোবর আজ অনেকগুলো ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে। সেই প্রাচীন মন্দির আজ ‘দেউলের ঢিবি’ নামে পরিচিত। আর সেই ছয়টি শিলাখণ্ডেই আজও পূজিতা হচ্ছেন গুপ্তযুগের মহাকবি কালিদাসের আরাধ্যা মা সরস্বতী। বেলুটি গ্রামের সরস্বতী পুজোর সময় অন্য কোনও মূর্তি-পুজো হয় না। সকলেই এই শিলামূর্তিকেই পুজো করেন। সমগ্র ভারতে কয়েকটাই সরস্বতী মন্দির আছে যেখানে বেলুটির মতো নিত্যপুজো হয়।
দুবরাজপুরের সরস্বতী
বীরভূমের দুবরাজপুরের খোসনগর গ্রাম সরস্বতী পুজোর জন্য বিখ্যাত। এখানকার জমিদার বাড়িতে এক বিশেষ ধাঁচের সরস্বতী মূর্তি দেখা যায়। মূর্তির গড়ন অনেকটা দেবী দুর্গার মতো। এক চালচিত্রের মাঝে থাকেন দেবী সরস্বতী এবং দুই পাশে দেবী লক্ষ্মী ও রাজলক্ষ্মী। তিনজনের হাতেই থাকে বীণা। চারপাশে সখীদের মূর্তি রয়েছে, তবে আকারে ছোট। সবচেয়ে আশ্চর্যের— এই সরস্বতীর বাহন হল বাঘ! দেবীর সামনেই থাকে দুটি বাঘের মূর্তি। আর কোনও সরস্বতী মূর্তিতে এমন বাহন দেখা যায় না। দুবরাজপুরের সরস্বতীর এটাই বিশেষত্ব। পুজো ঘিরে এলাকাবাসীর মধ্যে রীতিমতো উচ্ছ্বাস দেখা যায়। খোসনগরে দুটোই উৎসব সরস্বতী পুজো এবং পিরবাবার উরস। শাল নদীর পাড়ে রয়েছে পির কেসওয়ানি শাহ আবদুল্লা সাহেবের মাজার। রীতি মেনে এই মাজারে সিন্নি চড়ানোর পরে গ্রামের প্রাচীন সরস্বতী ঠাকুর বিসর্জন হয়।
হেতমপুরের সরস্বতী
বীরভুম জেলার তিনশো বছরের প্রাচীন হেতমপুরের চক্রবর্তী বাড়ির সরস্বতী পুজা প্রথম শুরু হয় হেতমপুরের রাজবাড়িতে, পরে চক্রবর্তী পরিবার তাঁদের নিজেদের বসতবাড়িতে সেই পুজো আয়োজন করেন। আমরা সাধারণভাবে যে দেবী সরস্বতীর মূর্তি দেখতে অভ্যস্ত তার থেকে এটা অনেকটাই আলাদা, একটি একচালার কাঠামো-তে তিনটি দেবী মূর্তি থাকে তার মাঝখানে অধিষ্ঠাত্রী নীলবসনা সরস্বতী তাঁর ডান দিকে ভগবতী অর্থাৎ মা দুর্গা এবং বাম দিকে মা লক্ষ্মী। তিন দেবীর দুই দিকে থাকেন জয়া ও বিজয়া। এখানে তিনটি মূর্তির বা ত্রিমূর্তি-র অর্থ দেবী ‘সরস্বতী’ জ্ঞানের প্রতীক, ভগবতী বা দুর্গা শক্তির প্রতীক আর মা লক্ষ্মী হলেন বিত্ত বা সম্পদের প্রতীক। জয়া ও বিজয়া হলেন সৌন্দর্যের প্রতীক। পুজোয় তিনটি ঘট স্থাপন করা হয়, একটি দেবী সরস্বতীর, বাকি দুটি ভগবতী অর্থাৎ মা দুর্গা ও মা লক্ষ্মীর। তাঁদের প্রথা অনুযায়ী বিসর্জনের সময় দেবী সরস্বতী ও ভগবতীর ঘট-দুটি বিসর্জন করে দিলেও দেবী লক্ষ্মীর ঘটটি তাঁরা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। এই বংশের পরম্পরা অনুযায়ী লক্ষ্মীর ঘট বিসর্জন দেওয়া যায় না। এই সরস্বতী ‘নীল সরস্বতী’ নামে পরিচিত। বহু প্রাচীন এই পুজো।
১০০ বছরের প্রাচীন সরস্বতী
হাওড়ার ‘উমেশচন্দ্র দাস লেন’ঢুকে সেই গলি বরাবর হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি মন্দিরের চূড়া। এটাই ১০০ বছরের পুরনো দেবী সরস্বতী মন্দির। হাঁস আর বীণা খোদাই করা মন্দিরের চূড়াটি রেঙেও উঠেছে দেবীর প্রিয় রং বাসন্তীতে। মন্দিরটি গায় লাগোয়া রয়েছে একটি বাড়ি। সেই বাড়ি উমেশচন্দ্র দাসেরই। তাঁর পরিবারই একশো বছরের বেশি দেবী সরস্বতীর নিত্যপূজার দায়িত্ব সামলে আসছেন। তবে এই সরস্বতী মূর্তি তাঁর প্রতিষ্ঠিত নয়। উমেশচন্দ্রের পুত্র রণেশচন্দ্র রাজস্থান থেকে এই মূর্তি নিয়ে আসেন। শ্বেতপাথরের সেই মূর্তিতে রাজস্থানি স্থাপত্যের ছাপও সুস্পষ্ট। মূর্তি উচ্চতায় প্রায় চারফুট। বাহন হাঁসের উপর দাঁড়িয়ে আছেন দেবী। বাঁ হাতে বীণা। দেবীর ঘাড়ও সামান্য বাঁ দিকে হেলানো। বিশেষ পুজোর দিনে মূর্তিটিকে ফুলের গয়নায় সাজানো হয়। গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত মূর্তির পিছনেও একটা দরজা রয়েছে। দু-বেলা ব্রাহ্মণ এসে দেবীর নিত্যপূজা সেরে যান। মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমীতে হয় দেবীর বিশেষ পুজো। দেবীর ভোগে থাকে বড় বাতাসা। যা নিয়ম করে ১০৮টা মাটির খুরিতে সাজিয়ে দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে ক্ষীরের গুজিয়া, ফল এইসবও ওই খুরিতে থাকে। তা ছাড়া খই, মুড়কি, মিষ্টি তো রয়েছেই।
দেশের সরস্বতী
পুষ্করের সরস্বতী
সারা বিশ্বে শুধু মাত্র রাজস্থানের পুষ্করই সেই স্থান যেখানে ব্রহ্মা পুজিত হন। পুষ্কর ব্রহ্মার নিবাসস্থল হিসেবেও খ্যাত। পাশের মন্দিরটিতেই বিরাজ করেন ব্রহ্মা-পত্নী সরস্বতী। এটি মূলত সাবিত্রী মন্দির নামেই খ্যাত। মন্দির লাগোয়া পুষ্কর হ্রদের একটি চূড়ায় স্থিত এই সরস্বতী মন্দির। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান যেখানে সরস্বতী, গায়ত্রী ও সাবিত্রী— এই তিন দেবীর মূর্তি একসঙ্গে পুজিত হন। কিংবদন্তি অনুসারে, ব্রহ্মা যখন যজ্ঞ করছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী সরস্বতী সময়মতো আসতে না পারায়, ব্রহ্মা একটি স্থানীয় মেয়ে (গায়ত্রী)-কে নিয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। এতে সরস্বতী রুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা ও গায়ত্রীকে অভিশাপ দেন। পরে সরস্বতীও গায়ত্রীর রূপ ধারণ করে এখানে পূজা পান বলে বিশ্বাস করা হয়।
পুষ্করের সরস্বতী
পুরাণ বলছে যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মহাঋষি বেদব্যাস গোদাবরীর কিনারায় এক সুন্দর অরণ্যের পাহাড়ি গুহায় অনেক বছর বাস করেছিলেন। বনের ফল, মধু ও ঝরনার জলই ছিল তাঁর জীবনধারনের একমাত্র সম্বল। সেই গুহার ভেতরে ব্যাসদেব তপস্যা করেন। তপস্যা সমাপ্ত হওয়ার পর, ব্যাসদেব স্নান করতে গিয়েছিলেন গোদাবরী নদীতে। সেই দিনটি ছিল বসন্ত পঞ্চমী। স্নান সেরে ব্যাসদেব হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিন মুঠো বালি। সেই বালি দিয়ে নদীর তীরে তৈরি করেছিলেন তিনটি ঢিপি। দৈববলে তিনটি বালির ঢিপি পরিণত হয়েছিল দেবী শারদা (সরস্বতী), মা মহালক্ষ্মী ও মা মহাকালীর চন্দন কাঠের বিগ্রহে। ত্রিদেবীকে তিন জায়গায় প্রতিষ্ঠা করে ব্যাসদেব শুরু করেছিলেন আরাধনা। দেবী শারদার বিগ্রহের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। সদানন্দময়ী দেবী জ্ঞানদার আশীর্বাদে কেটে গিয়েছিল ব্যাসদেবের মনে জমে থাকা হতাশার কুয়াশা। এরপর কেটে গেছে কয়েক হাজার বছর। বেদব্যাসের নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয়েছিল বসারা। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে এই বসারা ছিল নন্দাগিরি রাজত্বের অধীনে। সিংহাসনে তখন আসীন ছিলেন মহারাজ বিজিয়ালুডু তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এই মন্দিরে ব্যাসদেব নির্মিত সরস্বতী বিগ্রহকে বলা হয় ‘জ্ঞান সরস্বতী’।
মানা গ্রামের সরস্বতী শারদা
বিশ্বাস করা হয়, মহাবিশ্বে দেবী সরস্বতী প্রথম এই মানা গ্রামেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। যোশীমঠ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মানা গ্রাম। এটিই ভারতের শেষ গ্রাম। মহাভারত অনুসারে এই গ্রাম থেকেই মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেছিলেন দ্রৌপদী-সহ পঞ্চপাণ্ডব। এই মানা গ্রামে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সরস্বতী নদী। এই সরস্বতী নদীর উপর দ্রৌপদীর জন্য একটি সেতু নির্মাণ করে দিয়েছিলেন ভীম। এই মানা গ্রামেই সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মার মুখগহ্বর থেকে দেবী সরস্বতী আবির্ভূতা হন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। মানা গ্রামেই সরস্বতী নদীতে স্নান করে মহাভারত ও পুরাণ রচনা করেছিলেন মহামতি ব্যাসদেব। উত্তরাখণ্ডের মানা গ্রামে অবস্থিত সরস্বতী মন্দিরটি বিদ্যার দেবীর জন্য উৎসর্গীকৃত। পুরাণ অনুসারে সৃষ্টির শুরুতে এই মানা গ্রামেই ব্রহ্মার মুখ গহ্বর থেকে আবির্ভূতা হন বাগদেবী। শারদাম্বা সরস্বতী মন্দিরে মা সরস্বতী বাম দিকে এবং মা সাবিত্রী ডানদিকে স্থাপিত। পদ্মাসনে তিনি উপবিষ্ট।
বিদেশের বাগদেবী
মা সরস্বতী এতটাই জনপ্রিয় যে দেশের গন্ডি পেরিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশেও। বৌদ্ধ ধর্মই এর মূল কারণ। আসলে হিন্দু ধর্ম ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকলেও বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। শুধু ধর্মই নয়, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে প্রাচীন যুগ থেকে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কও এই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান চলতো। সেই প্রবাহে দেবী সরস্বতীও পৌঁছে যান তিব্বত, জাপান, থাইল্যান্ড, চিন, মায়ানমার এমনকী ইন্দোনেশিয়ায়।
তিব্বতের ইয়েং চেন মা
তিব্বতে সরস্বতী হলেন ‘ইয়েং চেন মা’।
বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান তন্ত্রানুসারে সরাসরিভাবেই সেখানের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সরস্বতী। তিব্বত বহুযুগ আগে থেকেই বৌদ্ধধর্মের অন্যতম পীঠস্থান ফলত, সেখানেও তিনি শ্বেতবস্ত্রা, মঞ্জুশ্রীর সঙ্গিনী। মহাযানতন্ত্রে দেবী সরস্বতীর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে— কোথাও তিনি দ্বিভুজা, কোথাও আবার চতুর্ভুজা বা ষড়ভুজা।
চিনের বিয়ানসাইতিয়ান
চিন দেশে সরস্বতী পূজিতা হন ‘বিয়ানসাইতিয়ান’ রূপে। মহাযানতন্ত্রে আর্য-সরস্বতীর চতুর্ভুজা রূপের ব্যাখা রয়েছে ‘বিয়ানসাইতিয়ান’ তারই অন্যতম রূপকল্প। দুই হাতে তিনি বীণাবাদনরতা, অন্য দু’হাতে রয়েছে পদ্ম এবং পুস্তক। আবার কোথাও তাই দক্ষিণ হস্তে পুস্তকের বদলে দেখা যায় হাতপাখাও। বৌদ্ধতন্ত্রানুসারে তিনি ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’। ‘সুবর্ণপ্রভাসূত্র’— বৌদ্ধগ্রন্থটিতে রয়েছে দেবী ‘বিয়ানসাইতিয়ান’-এর আরাধনার পদ্ধতিতে। চিনে পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হচ্ছে, সমগ্র চিন সাম্রাজের দায়িত্বে ছিলেন প্রতাপশালী চার চৈনিক সম্রাট। কী উপায়ে সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায়— বিয়ানসাইতিয়ান সেই শিক্ষাই দিয়েছিলেন তাঁদের।
জাপানের বেনজাইতেন
জাপানে দেবী সরস্বতী হয়ে ওঠেন ‘বেনজাইতেন’। তাঁর রূপকল্প জাপানি সংস্কৃতির মতো করেই তৈরি। জাপানের বিভিন্ন স্কুল এবং বৌদ্ধ মিশনারিতে তাঁর আরাধনা হয় নিয়ম করেই। এখানে তিনি শাড়ি পরিহিতা নন তাঁর বদলে পরেছেন ভারী পশমের পোশাক। হাতে বীণার বদলে জায়গা নিয়েছে ম্যান্ডোলিনজাতীয় চারটি তার বিশিষ্ট জাপানি বাদ্যযন্ত্র, বিওয়া। ষষ্ঠ শতাব্দীর জাপানি পুঁথিতে উল্লেখ পাওয়া যায় দেবী বেনজাইতেনের।
বর্মার থুরাথাডি
ভারতের আরেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমারেও পূজিতা হন সরস্বতী। বর্মায় তাঁর নাম‘থুরাথাডি’। সেখানেও বৌদ্ধ ধর্মের সূত্র ধরেই পৌঁছেছেন দেবী। বিদ্যার দেবী হিসাবেই আরাধনা হয় থুরাথাডির। তবে মায়ানমারের পুরাণে তাঁকে কল্পনা করা হয়েছে গ্রন্থগারিক হিসাবে। বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথির সংরক্ষক এবং চর্চার অধিষ্ঠাত্রী থুরাথাডি। আজও সেই আদলেই তৈরি হয় থুরাথাডির মূর্তি। বীণার বদলে থাকে তাঁর হাত-ভর্তি বই।

