হিয়ারিং হয়রানি— জটায়ুর কোনও নতুন উপন্যাস নয়। এ-রাজ্যের নিত্যদিনের দুর্ভোগের, হেনস্থার পাঁচালি হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।
পানিহাটিতে শুনানির লাইনে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটল বৃদ্ধের। বনগাঁয় শুনানিতে এসে ক্ষোভ উগরে দিলেন বিশেষভাবে সক্ষম এক ব্যক্তি। ৫০ বছরের শহিদুল মণ্ডল। ১৪০০ টাকা ভাড়া দিয়ে টোটোয় চেপে শুনানিতে এসেছিলেন। বলছেন, এই হয়রানির চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। উলুবেড়িয়া ১ নং বিডিও অফিসে শুনানিতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন মুসিবর সর্দার। তাঁকে উলুবেড়িয়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজে ভরতি করা হয়। ‘১৯৪৬ সাল থেকে আমাদের বাড়ি। ৭৭ সাল থেকে ভোটার তালিকায় আমার নাম রয়েছে। সেই থেকে আমি ভোট দিয়ে আসছি। আজ আমাকে শুনানিতে হাজির হতে হল।’ একথা যিনি বলছেন সেই প্রশান্ত চৌধুরী টিটাগড় পুরসভার ১৬ বছরের কাউন্সিলার, ১২ বছরের চেয়ারম্যান।
এসব এখন রোজকার বাস্তব। কমিশনের প্রতিদিনের মূর্খামির চলমান প্রকাশ।
এর মধ্যেই একটা নতুন কাণ্ড। জেনে হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারছি না। —নাম বিষ্ণুময় চক্রবর্তী। কবিতা লিখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কবি হিসেবে বিষ্ণুময়ের নাম ভাস্কর চক্রবর্তী। তাঁর লেখা বিখ্যাত লাইন,‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা? আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।’
শীতকাল এসে গিয়েছে শহরে। কবি চিরঘুমে চলে গিয়েছেন ২০০৫ সালে।
আর ২০২৬-এ কবির আসল নাম আর ছদ্মনামের প্যাঁচে তাঁর কন্যা প্রৈতী চক্রবর্তী। বর্তমানে অধ্যাপনা করেন। তাঁর যাবতীয় নথিতে বিষ্ণুময় নয়, ভাস্কর চক্রবর্তী নামটিই রয়েছে।
ব্যাস! আর যাবেন কোথায়? ম্যাপিংয়ের সমস্যা। ইলেকশন কমিশনের শুনানির নোটিশ পেয়েছেন। কবিপত্নী বাসবী চক্রবর্তী। বরানগর বিধানসভার বাসিন্দা। রাতভর জেগে মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য একটা এফিডেফিট খুঁজে বের করেছেন। তাতে লেখা, ভাস্কর ও বিষ্ণুময় একই ব্যক্তি। কমিশন সেই এফিডেফিট মানবে কিনা, জানা নেই।
জানা এইজন্যই নেই, বাংলা-সহ দেশের ১২ রাজ্যে একসঙ্গে এসআইআর শুরু হয়েছে। কিন্তু বাংলা ছাড়া অন্য রাজ্যে ছোটখাটো ভুল ইআরওরাই যাচাই করে নিষ্পত্তি করছেন। বাংলার ক্ষেত্রেই প্রতি ভোটারকে হাজির হতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। প্রথম দফায় এক লক্ষ ৪৫ হাজার ভোটারের শুনানি করার পর এখন ডাক পড়েছে ২ লক্ষ ৮১ হাজারের। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় দু’লক্ষ ভোটারের তথ্যে সামান্য বানান ভুল!
আরও পড়ুন-জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি
কেন?
এসআইআর শুরু করার বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন ইআরও এবং এইআরওদের ক্ষমতা দিয়েছিল। তাঁরা নথি দেখে সন্তুষ্ট হলে ভোটারকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে পারেন। এমনকী, তাঁরা ‘স্পিকিং অর্ডার’ও দিতে পারেন। কিন্তু প্রায় শেষের পর্যায়ে এসে ইআরও, এইআরওরা তা করতে পারছেন না। যে কোনও সন্দেহজনক ভোটারকেই শুনানিতে হাজির করতে বলা হচ্ছে।
জানা এই জন্যই নেই, রামপুরহাট পুরসভার ১০৭ পার্টের ভোটার প্রাক্তন জেলা জজ সন্তোষকুমার রায় ও তাঁর বছর ৬৫-র স্ত্রী স্বর্ণলতা রায়, দু’জনকেই এসআইআরের শুনানিতে শুক্রবার রামপুরহাট-১ ব্লক অফিসে তলব করা হয়েছিল। সন্তোষবাবুর মায়ের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম হওয়ায় সন্দেহজনক ভোটার হিসেবে তাঁকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। অন্যদিকে, শুনানিতে ডাকা হয় স্বর্ণলতাদেবীকেও। তিনি নাকি নো-ম্যাপিং ভোটার। লম্বা লাইনে কাগজপত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওই বৃদ্ধ দম্পতি। নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের বাড়িতে আধিকারিকদের যাওয়ার কথা। কিন্তু এই নিয়ে বিএলও তাঁদের কিছুই জানায়নি। তাই শুনানি কেন্দ্রে আসতে হয়েছে।
আরও পড়ুন-স্বপ্নটা এখনও বেঁচে, অবসর উড়িয়ে জকো আজ শুরু অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
জানা এই জন্যই নেই, কারণ, বিজেপির দেওয়া টার্গেট পূরণ করতে নির্বাচন কমিশন এখন নির্যাতন কমিশনে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে নদীয়ার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কালীগঞ্জ বিধানসভায় ৫৪ হাজার সন্দেহভাজন ভোটার ছিল। যা সর্বোচ্চ হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু বিগত এক মাসে তা ধাপে ধাপে কমতে থাকে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত ৫১ হাজার সন্দেহভাজন ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর গত পরশু অর্থাৎ শুক্রবার সেই সংখ্যাটি হঠাৎ বেড়ে প্রায় ৫৯ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে এ সম্ভব হল, তা বুঝতে পারছে না প্রশাসনও। আসলে, নির্বাচন কমিশন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ন্যক্কারজনক আচরণ করছে। বিজেপির কথায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটারদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। কালীগঞ্জের পাশাপাশি করিমপুর, পলাশিপাড়া ও চাপড়ায় খসড়া তালিকার তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় যাদের সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের বাইরে অন্য ভোটারদেরও কি এবার নোটিশ দিয়ে ডাকা হচ্ছে?
শুধু নদিয়া জেলাতেই এখনও পর্যন্ত ২ লক্ষ ৮১ হাজার আনম্যাপড ভোটারের মধ্যে ১ লক্ষ ৭০ হাজার ভোটারের শুনানি হয়েছে। এখনও এক লক্ষের বেশি আনম্যাপড ভোটারের শুনানি বাকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি থাকা ভোটারদেরও শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। সবমিলিয়ে এসআইআরে নোটিশ ইস্যু হবে ৮ লক্ষ ৩ হাজার ৩০২ জন ভোটারের নামে। এটা মানুষকে হয়রান করা ছাড়া আর কিছুই না।
এই যে ‘এসআইআর এসআইআর টর্চার’ চলছে তাতে হেনস্থা হয়রানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। মুসলমানের জানজা বের হচ্ছে রোজ। গতকাল শনিবারও তাতে ছেদ পড়েনি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানার মৌসুনি গ্রাম পঞ্চায়েতের বালিয়াড়া এলাকায় শেখ আব্দুল আজিজ (বয়স ৬২ বছর)-এর বাড়ির ১১ জনকে শুনানিতে ডেকেছে নির্বাচন কমিশন। তার পরেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কর্তার। পরিবারের সকলেরই ভোটার কার্ড রয়েছে। তা ছাড়া ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম আছে। ভোটার তালিকায় নাম আছে আব্দুলের বড় ছেলে ও বড় বৌমারও। তার পরেও আব্দুলের তিন ছেলে-বৌমা, নাতি-নাতনি মিলিয়ে মোট ১১ জনকে শুনানির নোটিশ পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তার পর থেকেই চিন্তায় পড়ে যান আব্দুল। গত কয়েক দিন ধরে পাগলের মতো বিভিন্ন নথিপত্র খোঁজাখুঁজি করছিলেন বৃদ্ধ। শুক্রবার রাতে পরিচিতদের কাছে গিয়ে আলোচনা করেন। এমনকী, কান্নাকাটিও করেন। বাজারেও কয়েক জনের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেছেন। তার পর বাড়ি ফিরে অসুস্থবোধ করেন তিনি। বাড়ির লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁকে। কিন্তু চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
ওদিকে, হুগলির বাঁশবেড়িয়ার বাসিন্দা সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েতের ৮৭ নম্বর বুথের ভোটার দিলশাদ আনসারি কয়েক পুরুষ ধরে বাঁশবেড়িয়াতে বাস করেন, নিয়মিত ভোটও দেন। এসআইআরের জন্য প্রয়োজনীয় গণনাপত্রও পূরণ করেছেন। তার পরেও শুনানির নোটিশ পেয়েছেন। জন্মের পর থেকে জানতেন তাঁরা চার ভাই। এসআইআর শুনানির নোটিশ পাওয়ার পরে জানতে পারলেন, তাঁরা ছয় ভাই!
কাজকর্ম ফেলে লাইন দিয়ে ‘বাবার ছেলে’ প্রমাণ দিতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন, সেটাই এখন নির্বাচন কমিশনের নির্যাতনে তিতিবিরক্ত বঙ্গবাসীর মনের কথা।
‘২০১১ সাল থেকে মানুষ শুধু লাইনেই আছে। নোটবন্দির লাইন। কোভিডের লাইন। টিকা নেওয়ার লাইন। এ বার আমাকে প্রমাণ দিতে হবে আমি আমার বাবার ছেলে নাকি! তাতেও লাইন।’

