দুধ না খেলে

মেয়েদের শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন থেকে রোগ প্রতিরোধ— সবকিছুর জন্য অপরিহার্য হল দুধ। তাই মহিলাদের জন্য দুধ খাওয়া জরুরি। কী কী পুষ্টিগুণ রয়েছে দুধে? সারাদিনে কতটা পরিমাণ দুধ খাবেন? দুগ্ধজাত দ্রব্যও কি সমান উপকারী? বিকল্প দুধের উপযোগিতা কী? এই নিয়ে লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

চৈতির বাড়িতে রোজ চারটে করে দুধের প্যাকেট আসে, দুটো ফ্যাট-যুক্ত দুধ এবং দুটো ফ্যাট-ফ্রি। চৈতির শ্বশুর যাই খান না কেন শেষে খই-দুধ ওনার চাই। ছেলে দুধ খেয়ে স্কুলে বেরয়, ফিরেও অনেক সময়ই দুধ খায়, এর সঙ্গে সারাদিন সবার চা-কফি তো আছেই। চামেলিকেও কখনও কখনও একটু দুধ দেয় চৈতি। গরিব মানুষ সারাদিন খাটে, ওই তো দুধ জ্বাল দেয়, ব্রেকফাস্ট রেডি করে। বাকি দুধ দিয়ে দই পাতে। বরের আবার দই ছাড়া চলে না একদিনও। চৈতি নিজেও খুব দুধ খেতে ভালবাসত। কিন্তু সংসারে সবার পুষ্টির খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের আর দুধ খাওয়া হয় না। যদিও চৈতি জানে তার বয়সি মহিলাদের জন্য দুধ কতটা জরুরি। কিন্তু উপায় কী!
আসলে নিজের স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা মহিলাদের একটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। ওয়র্কিং হোন বা গৃহবধূ, নিজে না খেয়ে পরিবার পরিজনকে খাওয়াতেই ভালবাসেন মহিলারা। কিন্তু দুধের পুষ্টি মহিলাদের সবচেয়ে বেশি দরকার।
ব্যালান্সড ডায়েটে নিয়মিত একগ্লাস দুধ থাকা মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা অপরিহার্য এটা অনেক মহিলাই জানেন না বা জানলেও চৈতির মতোই তাঁদের কিছু করার থাকে না। দুধ ঠিক কীভাবে মেয়েদের সাহায্য করে তা জানতে হলে আগে জানা জরুরি দুধে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলিকে।

আরও পড়ুন-মুম্বইয়ে ১১ লক্ষ ডুপ্লিকেট ভোটার

দুধের পুষ্টি উপাদান
দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম যা হাড়ের স্বাস্থ্যকে উন্নত করে বিশেষ করে মহিলাদের। দুধে রয়েছে ফসফরাস। এটিও হাড়ের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে। অন্যদিকে ভিটামিন ডি, মিনারেলস, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্কের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে ফসফরাস। ডিএনএ তৈরির জন্যেও জরুরি উপাদান হল ফসফরাস। ভিটামিন ডি এটাও বোন হেল্‌থের জন্য বিশেষভাবে কার্যকরী। হাড়ের স্বাস্থ্যের কথা বারবার বলার কারণ একটা বয়সের পরে মহিলাদের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি শুরু হয় তখন হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। গবেষণা অনুযায়ী পুরুষের থেকে মহিলারাই অস্টিওআর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিসের মতো সমস্যায় ভোগেন। তাই ছোট থেকেই মেয়েদের দুধ খাওয়া প্রয়োজন। দুধ নারী শরীরে খুব বড় পরিসরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে। এছাড়া দুধে রয়েছে ভিটামিন বি১২ যা নার্ভের কার্যকলাপ ঠিক রাখে, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ভিটামিন বি২ বা রাইবোফ্লোবিন যা শরীরকে প্রচুর এনার্জি সরবরাহ করে এবং আয়োডিন যা থাইরয়েডের কার্যকলাপকে সুস্থ রাখে এবং রয়েছে প্রোটিন।
বিভিন্ন বয়সের দুধের উপকারিতা
মায়েরা দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে তার ছোট্ট শিশুটির পিছনে ঘুরছে— এই দৃশ্য আমাদের খুব চেনা। আসলে প্রতিটি মা-ই চান তাঁর সন্তান দুধে-ভাতে থাকুক কারণ দুধই সুস্থ শরীরের ভিত গড়ে তোলে। শিশুর অপুষ্টি আজও পৃথিবী জুড়ে বৃহৎ সমস্যা। সমীক্ষা বলছে, বিশ্বে প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন শিশু চরম অপুষ্টির শিকার। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী সেই অপুষ্টি শিশু-কন্যাদের মধ্যে অনেক বেশি। তাই ছোট থেকেই অপরিহার্য হল দুধ। দুধে রয়েছে ম্যাক্রো এবং মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস দুই-ই যা দিনের শুরুতেই অপুষ্টির সমাধান করে দেয়।
কিশোর বয়স অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির মেয়েদের শরীরে অপুষ্টি কিন্তু ঘাতক। এই বয়সের মেয়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যও বিঘ্নিত হয় অপুষ্টির কারণে। তাদের শরীরে সঠিক পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি-এর সরবরাহ জরুরি যা একসঙ্গে দুধে মধ্যেই পাওয়া যায়। তা না হলে হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে, হাড় দুর্বল হয় এবং ভঙ্গুর হয়ে যায়। কিশোরী বয়সে ক্যালসিয়ামের অভাব পরবর্তীকালে হাড় ক্ষয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। ইদানীং ৩০, ৩৫ বছর বয়স থেকেই মহিলাদের অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে তার কারণ মেয়েদের শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের অভাব যার বেশিরভাগটাই দুধে মেলে।
এর সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের শরীরে প্রোটিনের চাহিদাও দুধই মেটায়। কারণ দুধ প্রোটিন জাতীয় খাদ্য। প্রতিদিনই কোনও কোনও কারণে পেশির ক্ষয় হয় আর সেই ক্ষতি পূরণ করে প্রোটিন। মাংসপেশির শক্তি বৃদ্ধি করতেও জরুরি প্রোটিন। এই প্রোটিনের অনেকটাই পাওয়া যায় দুধ থেকে। মহিলাদের মেনোপজের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতি শুরু হয়ে যায় ফলে বয়স যত বাড়তে থাকে এই হরমোনের অভাবেও হাড় ক্ষয় শুরু হয়। অস্টিওপোরোসিস, অস্টিও আর্থ্রাইটিস, অস্টিওম্যালেশিয়া রোগগুলো দেখা দিতে শুরু করে। দুধ প্রোটিন এবং ক্যালসিয়াম উভয়েরই জোগান দেয়।
দুধ খাওয়ার নিয়ম
দুধকে আমরা সুষম আহার বলি তার কারণ দিনের যে কোনও সময় দুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুধ খাওয়ার সবচেয়ে ভাল সময় হল ঘুমোতে যাবার আগে। এতে ঘুম ভাল হয় এবং শরীর অনেক বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে। বৈজ্ঞানিক মতে পাস্তুরাইজড দুধ খাওয়া বেশি স্বাস্থ্যকর কারণ এই পদ্ধতিতে দুধের অনেক জীবাণু নির্মূল করা হয়। বিশেষজ্ঞের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা দিনে ২-৩ কাপ দুধ খেতেই পারেন, তবে তার বেশি নয়। তবে যদি দুগ্ধজাত দ্রব্য, যেমন পনির, ছানাও খান, তা হলে দিনে ২ কাপের বেশি দুধ খাওয়া যাবে না। দুধ সবার সহ্য হয় না। যদি সকালে দুধ খেলে অ্যাসিডিটির সমস্যা হয় তাহলে ওই সময় না খাওয়াই ভাল। দুধ গরম বা ঠান্ডা দুটোই খেতে পারেন তবে যাঁদের গ্যাস্ট্রিক বা আলসার রয়েছে তাঁরা ঠান্ডা দুধ খান এতে বেশি উপকার পাবেন। দুধ খেলে যদি বমিভাব আসে তা হলে দুধ না খাওয়াই ভাল। দুধ সবসময় ভাল করে ফুটিয়ে খান ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে। দুধ ফ্রিজে জমিয়ে না রেখে যত টাটকা খাবেন তত ভাল, এতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণজনিত রোগ এড়িয়ে যেতে পারবেন।

আরও পড়ুন-তৃতীয় বিশ্ব থেকে অভিবাসন বন্ধের হুঁশিয়ারি

দুধের তৈরি
দুধ সুষম আহারের মধ্যে অন্যতম হলেও অনেকেই দুধ খেতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না, খেতে চান না বা খাওয়া হয়ে ওঠে না তখন তার পরিবর্তে দুগ্ধজাত দ্রব্য যেমন দই, ছানা, পনির ইত্যাদি খেতেই পারেন। দুধের তৈরি দ্রব্যের গুণও কিন্তু দুধেরই সমান।

দই
রোজ দুপুরে একবাটি দই খাওয়া যেতেই পারে। কারণ দই খাওয়ার আদর্শ সময় দিনের বেলা। দইয়ে রয়েছে প্রোবায়োটিক উপাদান পেট ফোলা ও হজমের সমস্যা কমাতেও সাহায্য করে। দইয়েও আছে ভিটামিন বি১২, ফসফরাস, পটাসিয়াম, এবং রাইবোফ্ল্যাভিন— বিশেষ করে মহিলাদের ঋতুস্রাবের সময়ে দই খেলে মানসিক উদ্বেগ, পেশির ব্যথা ও পেটে যন্ত্রণা কমাতেও সাহায্য করে। ঋতুস্রাবের সময় অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাতেও ভুগে থাকেন। সেই সমস্যাও কমে। পুষ্টিবিদরা বলছেন, প্রোটিন এবং ক্যালশিয়ামের সমৃদ্ধ উৎস হল দই। হা়ড় মজবুত করতে এবং শরীরকে ভিতর থেকে শক্তিশালী রাখতে দই খুবই কার্যকর। সন্ধ্যায় বা রাতে দই খাওয়ার পরিবর্তে দিনের বেলা ভাত-পাতে দই খান। যে কোনও বয়সি মহিলার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে দই।

ঘি
চৈতি ঘি খেতে ভয় পায়। ভাবে এই বয়সে ঘি খেলে যদি কোনও ক্ষতি হয়। আসলে পরিমিত পরিমাণে ঘি খাওয়া মহিলাদের জন্য উপকারী। কারণ ঘি কোষ থেকে ফ্যাট সলিউবল টক্সিন বার করে দেয়। এটি ফ্যাট পরিপাকে বিশেষ সাহায্য করে। ফলে শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট সহজেই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে দ্রুত ওজন কমে। ঘি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে ভাল কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। ঘিতে রয়েছে বিউটারিক অ্যাসিড এই অ্যাসিড যেমন প্রদাহ কমায় তেমনই ঘিয়ের মধ্যে থাকা ভিটামিনও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে ফলে একটা বয়সের পর মহিলারা অল্প পরিমাণে ঘি খেলে বাতজনিত ব্যথা কমে। আগে থেকেই হার্টের রোগ, কোলেস্টেরল না থাকলে দিনে এক থেকে দু’চামচ ঘি খেলে কোনও সমস্যা নেই বরং ভাল।

ছানা
ছানা, পনির মেয়েদের জন্য খুব উপকারী। দুধে যতই গুণ থাকুক ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের জন্য কারও কারও তা সহ্য হয় না। কিন্তু দুধের উপাদানগুলো শরীরে জন্য জরুরি তাই দুধের বদলে মহিলারা ছানা খেতেই পারেন। ছানায় থাকা ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি মহিলাদের স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা কমায়। ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি থাকার জন্য হাড়ও শক্ত থাকে। ফলে আর্থ্রাইটিসের প্রবণতা কমে। ছানার মধ্যে রয়েছে কেসিন যা শরীরে এসেন্শিয়াল আমাইনো অ্যাসিডের জোগান দেয়। যত বয়স বাড়ে বিশেষ করে মেনোপজের পরেও মহিলাদের শরীরে গঠন সুরক্ষিত রাখে এবং পেশির কার্যক্ষমতা বাড়ায়। হার্টের সমস্যা থাকলেও ফ্যাট-ফ্রি দুধের ছানা কিন্তু খাওয়া যেতে পারে। ছানাও প্রোবায়োটিক ফলে পেটের স্বাস্থ্য ভাল রাখে। শুধু ছানা নয়, ছানার জলেও উপকার। ছানার জলে থাকে অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন নামের প্রোটিন যেগুলো একটা বয়সের পরে মেয়েদের শরীরে হরমোনাল ইমব্যালেন্সজনিত সমস্যাকে কমায়। পেশি শক্ত করে। ছানা খাওয়ার কোনও নিয়ম নেই— সকালে দুপুরে, রাতে খাওয়ার সময় খেতে পারেন।

 

দুধের বিকল্প
এত উপকার থাকা সত্ত্বেও দুধ কারও কারও জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স রয়েছে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের কারণ হল দুধের মধ্যে থাকা ল্যাকটোজ নামক শর্করা। আমাদের শরীরে থাকা যে এনজাইম এই শর্করাকে ভাঙে তার নাম ল্যাকটেজ। কারও শরীরে এই ল্যাকটেজ কম বেরলে বা না বেরলে অন্যান্য এনজাইমের সঙ্গে এই শর্করার বিক্রিয়া হয় এবং পাকস্থলীতে তৈরি হয় বিষক্রিয়া। ফলে কারও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে সে দুধ খেলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের জন্য এখন মার্কেটে রয়েছে বিকল্প দুধের সম্ভার, যেমন সয়া মিল্ক, আমন্ড মিল্ক, পিনাট মিল্ক। এগুলো সবই উদ্ভিজ দুধ। এর মধ্যে সয়া দুধে থাকা আইসোফ্লাভোন মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের অভাব পূরণে সাহায্য করে, যা হট ফ্ল্যাশ এবং মুড সুইং-এর মতো লক্ষণ কমাতে পারে। সয়া দুধ স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমিয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। মেনোপজের পরে মহিলাদের জন্য হাড়ের ক্ষয় রোধ করে। আমন্ড মিল্কে থাকা ফাইটোইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা নিয়ন্ত্রণ করে। ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা, পিএমএস, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের সমস্যা প্রতিরোধ করে। পিনাট মিল্ক বা চিনাবাদামের দুধে রয়েছে প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন বি-৬-এর মতো পুষ্টি উপাদান যা মেয়েদের হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় খুব কার্যকরী। পেশি সবল করে, খুব ভাল ঘুম হয় এই দুধ নিয়মিত খেলে।

Latest article