Featured

ধর্মভিত্তিক বিভেদ নয় সাম্যের আবহ রচেছিলেন তিনি

১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ফাল্গুনী দোল পূর্ণিমা তিথির সন্ধ্যায় নবদ্বীপে জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর গৃহে বাঙালি সমাজের ত্রাতা রূপে যুগপুরুষ শ্রীগৌরাঙ্গর আবির্ভাব। ফাল্গুনী দোল পূর্ণিমা তিথির সন্ধ্যায় নবদ্বীপে জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর গৃহে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্টের আদি বাসিন্দা জগন্নাথ মিশ্রের সংস্কৃত ও শাস্ত্রচর্চার আগ্রহের কারণে নবদ্বীপে আগমন ও বসতি স্থাপন । পরবর্তী কালে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব নবদ্বীপকে সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় মানবতাবাদ চর্চার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। এর পরবর্তী অর্ধশতাব্দীকাল চৈতন্য মানবতাবাদের প্রবল প্রভাবে আপামর বাঙালি সমাজ ভেসে গিয়েছিল ভাবতন্ময়তার গভীর সাগরে। বাংলা সাহিত্য ও ধর্ম নব প্রাণের স্পন্দনে জেগে উঠেছিল, নতুন করে লেখা হয়েছিল বাংলার ইতিহাস। আসলে, মধ্যযুগীয় রাঢ় বঙ্গভূমির ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। যাকে চৈতন্য-রেনেসাঁস বললেও অত্যুক্তি করা হয় না।

আরও পড়ুন-চন্দ্রনাথের বাড়িতে ইডি, নেত্রীর ফোন

শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত থেকে কৃষ্ণভাবময় ভক্ত রূপে নবদ্বীপের নিমাইয়ের মনোজগতের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখে সেখানকার বৈষ্ণবসমাজ চমকে উঠেছিল। এই সমাজের নেতৃত্বে ছিলেন অদ্বৈত আচার্য। টোল চতুষ্পাঠী ছেড়ে হরিভক্তদের নিয়ে কৃষ্ণ নামসংকীর্তনে মেতে ওঠেন নিমাই। কঠোর বৈরাগ্যসাধনের প্ররোচনায় কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হন, সংসারধর্ম ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম ধারণ করেন। হিন্দুধর্মের জাতিভেদ উপেক্ষা করে সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে আপন করে নেন। হিন্দু-অহিন্দু, পণ্ডিত-মূর্খ, উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ না করে হরিবোল ও কীর্তনের মাধ্যমে ভক্তিধর্ম প্রচার শুরু করেন। এই ধর্ম আন্দোলন চৈতন্য বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম নামে পরিচিতি পায়।

আরও পড়ুন-ভ্রূণহত্যা আর নয়

চৈতন্য-প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম যবন হরিদাস বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। মহাপ্রভু যখন প্রবল হরিনাম আন্দোলন শুরু করেছেন কিছু গোঁড়া ব্রাহ্মণ ধর্মভয়ে ভীত হয়ে নবদ্বীপের শাসক চাঁদ কাজির কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কাজি উচ্চৈঃস্বরে নাম-সংকীর্তনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য সেই নির্দেশ অমান্য করে সংকীর্তন চালিয়ে যেতে থাকেন। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভারতে প্রথম আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা এখান থেকেই হয়েছিল। কাজির আইন অমান্য করে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সহযোগে বিশাল শোভাযাত্রা শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে নবদ্বীপের রাজপথে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে কাজির বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। ভীতসন্ত্রস্ত কাজি শ্রীচৈতন্যের আশ্বাস পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলে দু’জনের মধ্যে হিন্দুশাস্ত্র ও কোরান সম্পর্কে আলোচনা হয়। শুধু তাই নয়, সেই সময়ে জগাই-মাধাইকেও কৃষ্ণনাম দ্বারা উদ্ধার করেন। পতিতপাবন শ্রীচৈতন্যের ভক্তিডোরে বাঁধা পড়ে বাঙালি জাতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তার কীর্তনের গীতপ্রবাহ বহুধাবিভক্ত বাঙালির ধর্মকারার প্রাচীরে আঘাত হানে, ভক্তির এক অভিন্ন ধারায় মিলিয়ে দেয় বৃহত্তর বাঙালি জনসমাজকে। ভক্তি মার্গের প্রতি আকৃষ্ট মানুষ ভক্তিগীতের অভিন্ন মিছিলে অংশগ্রহণের ফলে কীর্তন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। শ্রীচৈতন্যের নগর সংকীর্তন বৈষ্ণবদের কাছে একটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়। ঢোল, করতাল, মৃদঙ্গ, মন্দিরা সহযোগে নৃত্যগীত ও কৃষ্ণভক্তি মিছিলে নবদ্বীপের পথঘাট মুখরিত হয়ে ওঠে। এই পন্থায় সমাজের সব ধর্মের মানুষ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের কীর্তন মিছিলের সদস্যে পরিণত হয়ে উঠেছিল অচিরেই।
ভারতের অন্য কোনও ভক্তি সংগীতে এই অভিনব মাধ্যমের উপস্থিতি ছিল না শ্রীচৈতন্যের দর্শনের বাহ্যিক প্রকাশ ছিল এই নগর সংকীর্তন। ঈশ্বর প্রেমের ভিত্তিভূমি ছাড়া মানবপ্রীতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না— এই উদারবাদী চেতনার মূল ভিত্তিকে সম্বল করে তৎকালীন ধর্মের তীব্র বেড়াজালকে চূর্ণ করে দিয়ে সাম্যের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। চৈতন্যের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের বেশির ভাগ পিছিয়ে পড়া নিঃসহায় মানুষ।

আরও পড়ুন-থিয়েটারে আজও লোকশিক্ষা হয়!

এখানে একটা কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তথাকথিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির পিছনে সমাজের বিত্তবান শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা এক ঐতিহাসিক সত্য। চৈতন্যদেব তেমন কোনও সহযোগিতা লাভ করেননি। বরং তিনি ছিলেন সে-সময়কার সমাজপতি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রক্ষক ও ধনী বিষয়ভোগীদের চক্ষুশূল। চৈতন্যের মানবতাবাদ প্রচারকে তারা কখনওই ভাল চোখে দেখেনি, প্রতি পদে পদে তারা চৈতন্যের চলার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে সর্ব সচেষ্ট ছিলেন। সমাজপতিরা নিম্ন শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষদের অস্পৃশ্য করে রাখার কৌশল অবলম্বন করতেন। কোনও রকম ধর্মাচরণের সুযোগ অস্পৃশ্যরা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না। কিন্তু শ্রীচৈতন্যের নাম সংকীর্তন দীর্ঘদিনের অবহেলিত শূদ্র জনগোষ্ঠীকে কৃষ্ণ নামে আপ্লুত হতে সাহায্য করেছিল।

আরও পড়ুন-ভ্রূণহত্যা আর নয়

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে নিম্নবর্ণের মানুষদের এক পঙক্তিতে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন, যা ছিল এক সমাজবিপ্লব। মহামিলনের এই ক্ষেত্রভূমিকে দৃঢ়বন্ধনে আবদ্ধ করতে চৈতন্যদেব জাত্যাভিমানের দেওয়াল ভেঙে দিতে পেরেছিলেন সহজভাবেই। সর্বজনীন আদর্শের অনুগত তাঁর ধর্মের ভিত্তিভূমি ছিল জীবে দয়া। সমস্ত সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যে তিনি অস্পৃশ্যতা বর্জনের আহ্বান জানান।
মহাপ্রভুর এই ভাব-আন্দোলন নিঃসন্দেহে বিজেপির বা গেরুয়া সংস্কৃতির বিপরীতে চলন। আর সেজন্যই চৈতন্যভূমি পশ্চিমবঙ্গে ওই গেরুয়া দুর্বৃত্তদের কোনও জায়গা নেই।

Jago Bangla

Recent Posts

নিজের কেবিনে একাধিক মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, সাসপেন্ড পুলিশকর্তা

এক নয়, একাধিক! নিজের দফতরে মহিলাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর শাস্তি পেলেন সেই পুলিশ আধিকারিক। কর্নাটক…

3 hours ago

রাজ্যে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রতিদিন ১ ডিগ্রি করে বাড়ছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। কলকাতা (Kolkata) থেকে আগামী কয়েকদিনে প্রবল শীতের কনকনানি…

3 hours ago

সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

নয়াদিল্লি : অভূতপূর্ব ঘটনা বিজেপিতে (BJP)। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই বিজেপি সভাপতি পদে বসলেন নীতিন…

3 hours ago

সিআরপিএফ ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার নাবালিকা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল ক্ষুব্ধ তৃণমূল

নয়ডা : ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে এখন নারী-নিরাপত্তার নামে যে কতবড় প্রহসন চলছে তা আরও…

3 hours ago

‘তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’

দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হত। এত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন সহ্যের সব…

3 hours ago

হাড় নিরাময়কারী আঠা

অর্থোপেডিক সার্জারির এক নতুন দিগন্ত। হাড় বা অস্থি, দেহের অন্যতম শক্ত অংশ যা আমাদের শরীরের…

3 hours ago