নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে আমরা যতটা ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাই, তার চেয়েও বেশি খুঁজে পাই স্মৃতির ভেতরে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে তাঁর কথা শেষ হয়ে যায় কয়েক পাতার মধ্যেই, কিন্তু মানুষের মনে তাঁর উপস্থিতি থামে না কখনও। স্বাধীনতার এত দশক পরেও তাঁকে ঘিরে আবেগ ফিকে হয়নি— বরং নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি বারবার ফিরে আসেন নতুন নতুন প্রশ্ন নিয়ে। কেন আজও নেতাজি এত জীবন্ত, এত আপন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল— নেতাজিকে মানুষ কেবল ইতিহাসের নেতা হিসেবে দেখেনি, দেখেছে নিজেদের একজন হিসেবে। তিনি এমন এক নেতৃত্বের প্রতীক, যাঁর জীবনযাপন ও সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নেতাজি কোনও রাজপরিবারে জন্মাননি, কোনও সামরিক বংশের উত্তরাধিকারীও ছিলেন না। তাঁর জন্ম কটকের এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে— যেখানে শাসন, শৃঙ্খলা আর শিক্ষার কড়াকড়ি ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন সফল আইনজীবী এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি পাওয়া মানুষ। অর্থাৎ, এই পরিবারটি ছিল উপনিবেশিক শাসনের কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। এই সামাজিক অবস্থানটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই বোঝা যায়—নেতাজি ছিলেন না প্রান্তিক কোনও বিদ্রোহী, আবার ছিলেন না শাসকশ্রেণির অংশও। তিনি ছিলেন সেই বিশাল মধ্যবর্তী শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের জীবন টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব আর সিদ্ধান্তের চাপে গড়ে ওঠে। এই জায়গাটাই আজও সাধারণ ভারতীয়কে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করে। কারণ সময় বদলালেও এই দ্বন্দ্ব বদলায়নি।
আরও পড়ুন-শুনানি হয়রানি বন্ধ হবে কবে, বিজেপির পুতুল হয়েই কমিশন রবে
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন ব্রিটিশ অধ্যাপক ওটেনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার পর যখন তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন সেটি নিছক একটি ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল আত্মসম্মান ও ন্যায়বোধের প্রশ্ন। এই ঘটনাটি নেতাজির জীবনে এক ধরনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়— যেখানে দেখা যায়, ব্যক্তিগত সুবিধা বা ভবিষ্যতের চেয়ে নিজের সম্মান তাঁর কাছে অনেক বড়। তাঁর জীবনের পরবর্তী প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তেই এই মনোভাব ফিরে ফিরে এসেছে। সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত— আইসিএস ছেড়ে দেওয়া—আজও সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯২০ সালে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় তিনি চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। আজকের ভাষায় বলতে গেলে, নিশ্চিত চাকরি, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা— সবকিছুই তখন তাঁর হাতের মুঠোয়। তবু তিনি নিজেই লিখেছিলেন, বিদেশি সরকারের অধীনে কাজ করা তাঁর বিবেকের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই সিদ্ধান্তকে তৎকালীন অনেকেই আবেগপ্রবণতা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই ঘটনাটিকে দেখেছে ভিন্ন চোখে। তাদের কাছে এটি ছিল সাহসী আত্মত্যাগের এক স্পষ্ট উদাহরণ— যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ নয়, দেশের প্রশ্নটাই মুখ্য।
এই জায়গা থেকেই নেতাজির জীবন সাধারণ মানুষের চোখে আলাদা হয়ে ওঠে। তিনি এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠেন, যাঁর জীবনের বড় বাঁকগুলো সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়। চাকরি ছেড়ে দেওয়া, নিরাপদ জীবনের গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে পড়া, অসুস্থ শরীর নিয়েও লড়াই চালিয়ে যাওয়া— এই অভিজ্ঞতাগুলো অচেনা নয়। বহু মানুষ নিজের জীবনেও এমন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। তাই নেতাজির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তিনি আমাদেরই একজন— শুধু একটু বেশি সাহসী, একটু বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই ‘আমাদের মতো’ হয়ে ওঠার অনুভূতিটাই নেতাজিকে আজও এত আপন করে রেখেছে। ইতিহাসের বহু নেতা ক্ষমতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে বড় হয়ে ওঠেন। কিন্তু নেতাজি বড় হয়ে উঠেছেন মানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে এমন এক সম্পর্ক, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো হয় না।
আরও পড়ুন-গম্ভীরের ভাবনায় অবশেষে অর্শদীপ, ইন্দোরে আজ ফয়সালার ম্যাচ
নেতাজির জনপ্রিয়তা কেবল তাঁর কাজের জন্য নয়, তাঁর কথা বলার ভঙ্গির জন্যও। ইতিহাসে অনেক বড় নেতা আছেন, যাঁরা অনবদ্য বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু খুব কম নেতা আছেন, যাঁদের ভাষা সাধারণ মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পেরেছে। নেতাজি ছিলেন সেই বিরল গোষ্ঠীর একজন। তিনি ভাষাকে অলংকারে ভরিয়ে তোলেননি। তাঁর বক্তৃতায় ছিল না জটিল তত্ত্ব, ভারী শব্দ বা দীর্ঘ উদ্ধৃতির বাহুল্য। ছিল সরাসরি আহ্বান, স্পষ্ট বার্তা। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর ভাষণগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি প্রায়ই ব্যবহার করেছেন ‘আমরা’ শব্দটি। ‘আমি’ বা ‘তোমরা’ নয়— এই ছোট্ট শব্দটি নেতা আর অনুসারীর মধ্যেকার দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল। মানুষ অনুভব করেছিল, এই নেতা তাদের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন না; তাঁদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। সবচেয়ে আলোচিত উক্তি— ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’— প্রায়ই কেবল একটি স্লোগানে পরিণত করা হয়। অথচ বাস্তবে এই কথাটি ছিল ১৯৪৪ সালের এক দীর্ঘ ভাষণের অংশ। সেখানে নেতাজি শুধু যুদ্ধের আহ্বান জানাননি; তিনি বলেছিলেন দায়িত্বের কথা, ত্যাগের কথা, এমনকী পরাজয়ের সম্ভাবনার কথাও। তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবতাকে আড়াল করেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন— এই লড়াই সহজ হবে না, কষ্ট হবে, প্রাণ যাবে, তবু থামা যাবে না। এই সততাই নেতাজিকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। তিনি কখনও মিথ্যে আশ্বাস দেননি। ইতিহাসের বিচারে এই অবস্থান কঠোর হতে পারে, কিন্তু মানুষের চোখে এটি ছিল সত্য কথা বলা একজন নেতার আচরণ। সাধারণ মানুষ নেতার কাছে নিখুঁত সমাধান চায় না; চায় সত্য কথা।
নেতাজির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল— তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, মানুষের ওপর থেকে কথা বলতেন না। আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাম্পে তিনি সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে একই খাবার খেতেন, একই তাঁবুতে থাকতেন। দীর্ঘদিনের হাঁপানির সমস্যা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত পরিদর্শনে যেতেন। নিজেকে আলাদা করে রাখেননি কখনও। এই দৈনন্দিন আচরণগুলোই তাঁকে কেবল কমান্ডার নয়, সহযোদ্ধায় পরিণত করেছিল। এখানেই নেতাজির সঙ্গে বহু সমসাময়িক নেতার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। তিনি জনপ্রিয়তা তৈরি করেননি প্রচারের মাধ্যমে; তৈরি করেছেন নিজের আচরণ দিয়ে। মানুষ দেখেছে— এই নেতা নিজের কথার সঙ্গে নিজের জীবনকে মিলিয়ে চলেন। তিনি যা বলেন, তা নিজেও পালন করেন। এই বিশ্বাসটাই ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। আজ আমরা হয়তো তাঁর পুরো ভাষণ মনে রাখতে পারি না, কিন্তু জানি— তিনি মিথ্যে বলেননি। আর সাধারণ মানুষ নেতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোঁজে এই জায়গাটাই। তাই নেতাজির কণ্ঠ আজও কানে বাজে, লড়াইয়ে, প্রতিবাদে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

আজাদ হিন্দ ফৌজকে অনেক সময়ই কেবল একটি সামরিক বাহিনী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি— একটি সামাজিক পরীক্ষাগার। এখানেই প্রথমবার বিপুল সংখ্যক সাধারণ ভারতীয় সরাসরি দেশের স্বাধীনতার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এই জায়গাটাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে আজও আলাদা করে তোলে। আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে উঠেছিল মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে— মালয়, সিঙ্গাপুর, বার্মা অঞ্চলের শ্রমিক, দোকানকর্মী, রেলকর্মী, কুলি, ছোট ব্যবসায়ী। এঁদের অনেকেই পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। অনেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন শুধুমাত্র জীবিকার তাগিদে, রাজনৈতিক চেতনা থেকে নয়। কিন্তু নেতাজির নেতৃত্বে এই মানুষগুলিই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ান। এই ফৌজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল— এখানে শ্রেণিভেদ তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। একই সারিতে দাঁড়িয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বিভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ। ধর্ম, ভাষা কিংবা আঞ্চলিক পরিচয়কে নেতাজি সচেতনভাবেই প্রাধান্য দেননি। তাঁর বক্তৃতা ও নির্দেশনায় বারবার একটাই পরিচয় সামনে এসেছে— তোমরা ভারতীয়। সেই সময়কার বাস্তবতায়, যখন সমাজে বিভাজন ছিল গভীর, তখন এই অবস্থান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঝাঁসির রানি বাহিনী ছিল এশিয়ার প্রথম সর্বভারতীয় নারী সামরিক ইউনিটগুলির একটি। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মী সহগল। এটি কেবল প্রতীকী কোনও উদ্যোগ ছিল না। এই বাহিনীর সদস্যরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে ছিলেন এবং প্রয়োজনে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এটি ছিল এক বিপ্লবী পদক্ষেপ। নেতাজি নারীকে কেবল ত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন কর্মের সহযোদ্ধা হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের মনেও নতুন চিন্তার জন্ম দেয়। স্বাধীনতার লড়াই যে কেবল পুরুষদের দায়িত্ব নয়— এই বার্তাটি আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে বাস্তব রূপ পেয়েছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত দিক হল প্রবাসী ভারতীয়দের ভূমিকা। উপনিবেশিক ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তাঁরা স্বাধীনতার সংগ্রামকে নিজেদের বলে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থ দান, স্বেচ্ছাশ্রম, সন্তানদের ফৌজে পাঠানো— এই সবই ছিল তাঁদের অবদান। নেতাজি এই মানুষগুলিকে কেবল দূরের সমর্থক হিসেবে দেখেননি; আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সম্মান দিয়েছেন। এই অংশীদারিত্বের অনুভূতিই আজাদ হিন্দ ফৌজকে আলাদা করে। এখানে কেউ দর্শক ছিল না, সবাই ছিল ইতিহাসের অংশ। সাধারণ মানুষের এই সক্রিয় ভূমিকা নেতাজিকে মানুষের আরও কাছে এনে দেয়। মানুষ দেখেছিল— এই লড়াই তাদের হাত দিয়েই এগোচ্ছে। স্বাধীনতার পরে যখন লালকেল্লায় আইএনএ ট্রায়াল শুরু হয়, তখন ভারত জুড়ে যে আবেগের ঢেউ উঠেছিল, তার পেছনেও এই কারণটি গভীরভাবে কাজ করেছিল। অভিযুক্তরা কেবল সৈনিক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সাধারণ পরিবারের ছেলে-মেয়ে— যাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই স্মৃতি আজও মানুষের মনে বেঁচে আছে।
আরও পড়ুন-দিনের কবিতা
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন যেন শুরু থেকেই এগিয়েছে তাড়াহুড়ো করে, কিন্তু শেষটা এসে থেমে গেছে হঠাৎ। ১৯৪৫ সালের পর তাঁর উপস্থিতি ইতিহাসের স্পষ্ট আলো থেকে সরে যায়, শুরু হয় প্রশ্নের সময়। এই অনিশ্চয়তা বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু আবেগের দিক থেকে দেখলে, এই অসমাপ্ততাই তাঁকে আরও আপন করে তুলেছে। ভারতের ইতিহাসে খুব কম নেতার জীবন এমনভাবে থেমে গেছে, যার কোনও নিশ্চিত সমাপ্তি নেই। নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে স্বাধীনতার পর একাধিক তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে। নানা মত, নানা সাক্ষ্য, নানা সিদ্ধান্ত— তবু সাধারণ মানুষের মনে একটি অনুভূতি থেকেই গেছে : তিনি পুরোপুরি চলে যাননি। এই বিশ্বাস ঐতিহাসিক প্রমাণ দাবি করে না, কিন্তু মানবিক অনুভূতির জায়গায় দাঁড়িয়ে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। অসমাপ্ত গল্প মানুষ চিরকাল আঁকড়ে ধরে। কারণ সেখানে কল্পনার জায়গা থাকে, প্রশ্ন থাকে, অপেক্ষা থাকে। নেতাজির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি ইতিহাসের পাতায় সমাধিস্থ হননি; স্মৃতির ভেতর দিয়ে চলতে থেকেছেন।
আরেকটি বড় কারণ হল— নেতাজি কোনও রাজনৈতিক দলের একার সম্পত্তি হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, আবার কংগ্রেস ছেড়েছেনও। গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য ছিল প্রকাশ্য, কিন্তু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অটুট ছিল। নেহরুর সঙ্গে আদর্শগত দূরত্ব থাকলেও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। স্বাধীনতার পর কেউই তাঁকে নিজেদের উত্তরাধিকার বলে সম্পূর্ণভাবে দাবি করতে পারেননি। এই অবস্থানটাই তাঁকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে, কিন্তু নেতাজিকে দেখে আস্থার চোখে। কারণ তিনি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাননি, আপস করার সুযোগও পাননি। তিনি রয়ে গেছেন সেই মানুষটি, যিনি বিশ্বাস করতেন— কাজই শেষ কথা।

আজকের ভারতের বাস্তবতায় এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়ে ওঠে। যখন চারদিকে অনিশ্চয়তা, বিভাজন আর ক্লান্তি, তখন নেতাজির শৃঙ্খলা, আত্মসম্মান আর দায়িত্ববোধ মানুষের কাছে এক ধরনের আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তরুণদের কাছে তিনি এখনও একটি প্রশ্নচিহ্নের মতো— আমরা কি সত্যিই দেশের জন্য কিছু দিতে প্রস্তুত? এই কারণেই নেতাজি আমাদের কাছে কেবল ইতিহাসের নায়ক নন। তিনি এক ধরনের নৈতিক মানদণ্ড। তাঁর জীবনের দিকে তাকিয়ে মানুষ আজও নিজের জীবনকে মাপে। তিনি নিখুঁত ছিলেন না, তাঁর পথ ছিল বিতর্কিত, সিদ্ধান্ত ছিল কঠিন। তবু তিনি ছিলেন সৎ— নিজের বিশ্বাসের প্রতি। এই সৎ থাকার জায়গাটাই তাঁকে আজও আপন করে রেখেছে। কারণ সাধারণ মানুষ নিখুঁত মানুষ চায় না, চায় বিশ্বাসযোগ্য মানুষ।
আরও পড়ুন-ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির মুখে চাবাহার আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষিতে ভারত
নেতাজিকে নিয়ে তাই আজও এত কথা হয়— লেখা হয়, তর্ক হয়, আবেগ তৈরি হয়। কারণ তিনি আমাদের অতীতের কেউ নন; তিনি আমাদের প্রশ্নের সঙ্গী। ইতিহাসের নেতা নন, স্মৃতির আত্মীয়। আর ঠিক এই কারণেই, এত বছর পরেও, নেতাজির নাম উঠলে আমরা আজও বলি— ইনি আমাদেরই কাছের মানুষ।










