গেরুয়াপক্ষের স্বৈরশাসনে পঠন-পাঠন এলোমেলো

হিটলারের জমানায় জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থা নাৎসি মতাদর্শের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। একই রকম অন্ধকার ক্রমশ ঢাকছে আমাদের শিক্ষার ভুবন। আইআইটি থেকে আইআইএম, আইএসআই, প্রতিটি প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই গেরুয়া হানাদারির সৌজন্যে উৎকর্ষহীনতার তমিস্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। আজকের ভারতের উগ্র হিন্দুত্বের দাপাদাপি নাৎসি জার্মানির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আজকের শেষ পর্বে লিখছেন অধ্যাপক প্রিয়ঙ্কর দাস

Must read

(গতকালের পর)
দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়েছে গোটা মোঘল আমল, দশম ও একাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়েছে ‘গণতন্ত্র ও বৈচিত্র’, ‘গণতন্ত্রের বাঁধা’, ‘জনপ্রিয় সংগ্রাম ও আন্দোলন’ নামক অধ্যায়গুলো, দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ‘আরএসএসের মতো সংগঠনকে কিছু সময়ের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল’ বাক্যটিকে। এনসিআরটির মূল লক্ষ্য অন্যান্য ধর্মবিদ্বেষী, উগ্র হিন্দুত্ববাদের ইতিহাসকে ঢেলে সাজানো, ভ্রান্তভাবে যা ন্যায্যতা প্রদান করবে আরএসএস-এর মতাদর্শে পরিচালিত বিজেপি সরকারকে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চ-এর মতো স্বশাসিত সংস্থা নতুনভাবে ভারতবর্ষের ইতিহাস লেখায় নিযুক্ত, এই সংস্থার সদস্য সচিব আরএসএস পন্থী অধ্যাপক উমেশ কদম বলেন, “মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছিল, ভারতের সংস্কৃতির সাথে তাদের সরাসরি কোন সংযোগ নেই”। বিজেপি সরকার পরিচালিত কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় বুদ্ধি বৃত্তিক নম্রতা, সহিষ্ণুতার জায়গা নিয়েছে অসহিষ্ণু একক মতবাদ, ধর্মীয় বহুত্ববাদের জায়গা নিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ। ঠিক একই ভাবে নাৎসি জার্মানিতে ‘রেসিয়াল সায়েন্স’ নামে এক নতুন বিষয়ের পাঠ্যক্রম রচিত হয়েছিল যে পাঠ্যক্রমের বিষয় ছিল দৈহিক কাঠামো দেখে কীভাবে ইহুদি মানুষকে শনাক্ত করা যায় তার আলোচনা।
১৯৩৮ থেকে ১৯৪২ সালের নাৎসি জার্মানিতে সরকার একের পর এক স্কুল বন্ধ করে দেয়, পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন করে। সমভাবে আমরা দেখতে পাই বিজেপি সরকার ২০২০ সালের নতুন শিক্ষানীতি আনয়ন করেছে তা বেশিরভাগই ত্রুটিপূর্ণ ও অসঙ্গত। এম ফিল বৃত্তির অবলুপ্তির কথা বলা হয়েছে, এতে সমাজ বিজ্ঞান ও সাহিত্যধর্মী বিষয়গুলোর গবেষণা ব্যাহত হবে ও উৎকর্ষতা হারাবে। প্রশ্ন আসে যে, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যধর্মী বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের এই বৈমাতৃক আচরণ কেন, উত্তরটা একটু ভাবলেই পরিষ্কার হবে যে, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের বিষয়গুলো ছাত্রছাত্রীদের সমাজ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে, যুক্তির আলোকে সমাজকে দেখতে শেখায়, কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রদর্শনগুলোর পাঠ দেয়— সেটাই চায় না আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার, তারা চায় না ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমাজ বোধ জাগরিত হয়ে তারা স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতায় নামে। বিগত বাজেটে অর্থমন্ত্রক উচ্চশিক্ষা খাতের বরাদ্দ তার পূর্ববর্তী আর্থিক বাজেটের তুলনায় ৯৬০০ কোটি টাকা কমিয়ে দিয়েছে। দেশের উৎকর্ষতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট-সহ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ক্ষেত্রেও আর্থিক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

আরও পড়ুন- ২৫ বছরে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প তাইওয়ানে! মৃত ৪, আহত ৬০

একদিকে যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করছে কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক তখনই তার বিপরীতে শিক্ষা ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করতে, ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দিতে, শিক্ষকদের উদ্যমী রাখতে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত করে চলেছেন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে দশগুণ, ত্রিশটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে চব্বিশটা, সাত হাজার নতুন স্কুল স্থাপিত হয়েছে, সমস্ত স্কুলে পানীয় জল, শৌচাগার, মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, নতুন এক লক্ষ ত্রিশ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা হয়েছে, ২০২২ সাল অবধি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিয়োগ করা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার, অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়েছে ২৭০ জন, প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তন করে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
স্বৈরতান্ত্রিক হিটলার শিক্ষার মাধ্যমে আনুগত্যতা অর্জনের জায়গাটির গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন, ১৯৩৩ সালের ৬ নভেম্বর এক ভাষণে তিনি বলেন, “When an opponent declares, ‘I will not come over to your side,’ I calmly say, your child belongs to us already.” অর্থাৎ নাৎসি মতাদর্শগত শিক্ষার আলোকে আগামীকে তিনি যে আচ্ছন্ন করে রাখবেন তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের দেশেও এই নাৎসি রূপী গণতন্ত্র হত্যাকারী বিজেপি সরকারের শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে তাই প্রয়োজন সেইসব আলোকময় শিক্ষক- শিক্ষিকাদের, যারা প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়, প্রশ্ন করতে শেখায়, বিশ্লেষণ করতে শেখায়। তাই একান্ত জরুরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ছাত্র-শিক্ষক জোটবদ্ধতার।
(শেষ)

Latest article