পারিয়া

‘বঞ্চিতের লড়াইয়ের ইতিহাস সবসময় রক্ত দিয়েই লেখা হয়।’ না-মানুষদের জন্য সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস লিখলেন অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। সিক্স প্যাক অ্যাবে এক নতুন অবতারে তিনি অবতীর্ণ পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘পারিয়া’তে। সদ্য মুক্তি পাওয়া এই ছবি নির্বাসিত, ব্রাত্য, পথকুকুরদের গল্প শোনাল দর্শকদের। দিল সামাজিক বার্তা। লিখছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

হাতে ধারালো অস্ত্র, গা-বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত, রুক্ষ চেহারা, চোখ-মুখে তীব্র রাগ, চরম সহিংস আর বর্বর, হিংস্র ছেলেটার কোলে ছোট্ট এক সারমেয়। অসহায়, বঞ্চিত পারিয়াদের দয়ালু মসিহা সে। অদ্ভুত এক বৈপরীত্য। এমন একটা চরিত্রে পারফেক্ট সিক্স প্যাক অ্যাবে নতুন অবতারে অবতীর্ণ অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। ছবির নাম ‘পারিয়া’। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির পোস্টার দেখেই বোঝা গেছিল অবলা কুকুরছানাটির রক্ষাকর্তা রূপেই ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে। কিন্তু কী এই ‘পারিয়া’? কেন এমন নাম নামকরণ? ‘পারিয়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ব্রাত্য। ভারতবর্ষের পথেঘাটে থাকা বেওয়ারিশ নামগোত্রহীন কুকুরদের ‘পারিয়া’ বলা হয়। এই ছবির আসল হিরো এই সব পারিয়া অর্থাৎ পথকুকুরেরা। আসলে পারিয়াদের কোনও ঘর হয় না, তারা আশ্রয়হীন, পরিচয়হীন। একটি মানুষ তাদের জন্য লড়বে। রক্ত দিয়ে লিখবে সেই বঞ্চিতদের ইতিহাস।

আরও পড়ুন-এনডিএতে যাবেন না, জানালেন পালানিস্বামী

গত বছর মে মাসে শেষ হয়েছিল এই ছবির শ্যুটিং। জানুয়ারি ‘পারিয়া’র টিজার লঞ্চের পরেই বিক্রমের লুক নিয়ে সাড়া পড়ে গিয়েছিল অনুরাগীদের মধ্যে। নিজেকে একেবারে ভেঙে গড়েছেন বিক্রম। কিন্তু কেন? ছবির বিষয়টাই বা কী? সেই নিয়ে কৌতূহলী ছিলেন দর্শক। ধীরে ধীরে জানা গেল পথকুকুরদের নিয়ে অন্য এক গল্প বলবে পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের এই ছবি। কথামতোই ৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়েছে ‘পারিয়া’।
এমন একটা বিষয় কেন বাছলেন সেই প্রসঙ্গে পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায় জানান, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সময় আমি দেখেছি পথকুকুরদের কী বীভৎস অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়। সেই থেকেই বিষয়টা মাথায়। আমার এই ছবি রাস্তার এই পশুদের প্রতি অবিচারের বিরোধিতার গল্প।

আরও পড়ুন-রফাসূত্র এখনও অধরা, ফের কৃষকদের দমাতে কাঁদানে গ্যাস

ছবিটি প্রযোজনা করেছে প্রমোদ ফিল্মস এবং ড্রিমস অন সেল সংস্থা। বিক্রম ছাড়া ছবিতে মুখ্যভূমিকায় দেখা যাবে অঙ্গনা রায়, শ্রীলেখা মিত্র, সৌম্য মুখোপাধ্যায় ও অম্বরীশ ভট্টাচার্যকে।
এই ছবিতে ক্যামেরার কাজ, অ্যাকশন দৃশ্য, কোরিওগ্রাফি বেশ দর্শনীয়। তবে ছবির শুরু থেকে শেষ নজর কাড়বেন বিক্রমই। চেনা ইমেজ ভেঙে বড়পর্দায় এক নতুন ইমেজে ধরা দিলেন বিক্রম। নিজের শরীরী ভাষাকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন তিনি এই ছবির জন্য । ‘শেষ পাতা’ এবং ‘অর্ধাঙ্গিনী’র পর আর একটি অন্যরকম চরিত্রে। ফলে নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন অভিনেতা।
‘পারিয়া’ ছবিতে নিজের চরিত্র নিয়ে অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায় জানালেন, ছবিতে আমার চরিত্র লুব্ধক কারখানায় কাজ করে। পাইস হোটেলে খেয়েদেয়ে দিন গুজরান তার। সেই হোটেলের মালকিন কুকুরদের ভালবাসে। কারণ সেই হোটেলে রোজ আসে পথকুকুররা। সেখান থেকেই কুকুরবাচ্চার প্রতি তার টান তৈরি হয়। বন্ধন তৈরি হয়। নিজের চেহারার এই বদল সম্পর্কে তিনি বললেন, আমার ইমেজ ভাঙার চেয়েও চরিত্রের প্রয়োজনে এই চেহারার দরকার ছিল।
‘পারিয়া’র কনসেপ্ট খুব মৌলিক। যার লেখক স্বয়ং তথাগত। পুরো কনসেপ্ট এবং স্টোরি লাইন নিয়ে পরিচালক জানালেন, পারিয়া হল বিদ্রোহের গল্প। নির্বাসিতের গল্প। ছবির মুখ্য অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায় সমস্ত পারিয়ার সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়, কারণ কেউ তাদের পক্ষে কথা বলে না, তাদের পক্ষে লড়াই করার জন্য কেউ নেই। বিক্রমকে প্রথমবার এই অবতারে দেখতে পাবেন দর্শকরা। আশা করি সবার পছন্দ হবে।

আরও পড়ুন-গত লোকসভা ভোটে ইভিএমে ধরা পড়ে ব্যাপক যান্ত্রিক ত্রুটি! প্রকাশ্যে আরটিআই রিপোর্ট

যদিও এই ছবিতে পারিয়াদের উদ্ধারকর্তা শুধু একা বিক্রম নন, তার সঙ্গে রয়েছে রাস্তার ধারে বয়স্কা হোটেলওয়ালিও। অভুক্ত পথসারমেয়দের প্রতি তার ভালবাসাও মনে থেকে যায়। রয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী, এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। সংস্থায় সদ্য যোগ দেওয়া কমলিনী (অভিনেত্রী অঙ্গনা রায়)। আর রয়েছে শয়তান প্রোমোটার আর মাংস বিক্রেতা যে খাসির মাংসের আড়ালে কুকুরের মাংসের অসাধু, অনৈতিক ব্যবসায় যুক্ত। এই দুটি চরিত্রে রয়েছেন লোকনাথ দে এবং সৌম্য মুখোপাধ্যায়। ধনী ব্যবসায়ীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অম্বরীশ ভট্টাচার্য। ছবিতে রয়েছে আরও বেশ কিছু চরিত্র যারা গল্পের মোড়গুলোয় দেবে নানান ট্যুইস্ট। পরতে পরতে উঠে আসবে সারমেয়দের অধিকারের লড়াই। তবে ‘পারিয়া’ দেখতে গেলে অনেকের মনে হতেই পারে প্রচুর অ্যাকশন এবং রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের বিশেষ দরকার ছিল না। আর একটু নরম প্রেক্ষাপট রাখলেই বিষয়টা দারুণ হতে পারত। এই ছবি দেখতে আঠারো বছর না হলে সিনেমা হলে প্রবেশ নিষেধ কারণ বেশ ভায়োলেন্স রয়েছে ছবিতে। তাই মনে হয় এমন একটা মানবিক বিষয় এবং বার্তা আঠারোর নীচের কিশোর-কিশোরীদের কাছেও পৌঁছনো দরকার ছিল।

আরও পড়ুন-সন্দেশখালিকে অশান্ত করতে ফাঁস বিজেপির চক্রান্ত, প্রকাশ্যে অগ্নিমিত্রার ষড়যন্ত্রের অডিও টেপ

পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের বেশিরভাগ ছবি সামাজিক বার্তাবাহী যেমন ‘শুঁয়োপোকা’, ‘ভটভটি’ ইত্যাদি। এবার ‘পারিয়া’। যেখানে ব্যতিক্রম ঘটেনি। এই প্রথম কোনও পরিচালক বাংলা সিনেমায় রাস্তায় ঘুরে-বেড়ানো বেওয়ারিশ কুকুরদের বঞ্চনা, সমস্যা, যন্ত্রণা, অত্যাচার, অবিচার তাদের প্রতি সমবেদনা— এই বিষয়গুলোর দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বেওয়ারিশ কুকুরদের নিয়ে যে পাশবিক অসামাজিক ব্যবসা চলে সেই কুচক্রীদের দিকেও আঙুল তুলেছেন। খুব ভাল বিষয় ও বক্তব্য।
তবে সিনেমায় লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াটাও কিন্তু একটা ছবি তৈরির ক্ষেত্রে বড় উদ্দেশ্য তো বটেই! তাই মনে হয় মহৎ উদ্দেশ্যকে পাশে রেখে অ্যাকশন প্যাক ছবি করার কথাই ভেবেছেন তিনি। সেদিক থেকে এই ছবি কতটা সফল হয় সেটাই দেখার।

Latest article