মোদি জমানায় ভুয়ো বিজ্ঞানের রমরমা

আরও অনেক কিছুর সঙ্গে বর্তমান ভারতে ভিত্তিহীন বিজ্ঞানচর্চার রমরমা ক্রমবর্ধমান। ভুয়ো খবর, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির সঙ্গে সমানুপাতে বাড়ছে ভিত্তিহীন বিজ্ঞানচর্চা, মদতদাতা স্বয়ং মোদি সরকার। লিখছেন দেবাশিস পাঠক।

Must read

‘‘I hate science. It denies a man’s responsibility for his own deeds, abolishes the brotherhood that springs from fatherhood… It is far easier for a Hitler or a Stalin to find a moch-scientific excuse for persecution than it was for Dominic to find a mock-christian one. ” –Basil Bunting
ভারতের বিজ্ঞান-পটটি এখন নতুন নতুন ভাবনাচিন্তায় আকীর্ণ। ১০৮টি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্মের রহস্য থেকে শুরু করে গো-বিজ্ঞান, ক্যানসার নিরাময়ে তন্ত্রের প্রয়োগ থেকে শুরু করে স্বস্তিকা চিহ্নের সঙ্গে আধুনিক পদার্থবিদ্যার যোগাযোগ প্রভৃতি নানাবিধ ভাবনাচিন্তা সেখান উপচীয়মান। ভারতের মহাকাশবিজ্ঞানীরা যখন চাঁদের বুকে কিংবা সূর্যের কাছাকাছি কোনও বিন্দুতে গগনযান পাঠাতে ব্যস্ত, তখনই অপরাপর বিজ্ঞানীগণ ধর্মীয় প্রতীক আর গো-বিজ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে একুশ শতকের বিজ্ঞানচর্চার বলয়ে প্রাচীন যুগের আবেশ।

আরও পড়ুন-পুজোর নেপথ্যে সেবাইত থেকে জমিদার হওয়ার গল্প

ব্যাপারটা একদিন হাসি-মশকরার জায়গায় ছিল। এখন আর তা থাকছে না। এখন দেখা যাচ্ছে আইআইটির ডিরেক্টরও আমিষ ভক্ষণের সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের যোগসূত্র খুঁজে বের করে তা নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন! নরেন্দ্র মোদির জমানায় বিজ্ঞান-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষে বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তির চেয়ে হিন্দি-হিন্দুত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তির আধিক্য বেশি। সেজন্যই এই পট-পরিবর্তন। যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞান মনস্কতার চেয়ে ধর্মীয় আচার-সংস্কার-উপাচার নিয়ে এত আদিখ্যেতার রমরমা।
গত মাসেই একটা ভিডিও ক্লিপিং সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল (এই কলমচি অবশ্য সেটির সত্যতা যাচাই করেনি)। সেই ক্লিপিংয়ে দেখা গিয়েছিল, মান্ডি আইআইটি-র ডিরেক্টর লক্ষ্মীধর বেহেরা ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘তোমরা নিরীহ পশুদের হত্যা করছ। এর সঙ্গে পরিবেশ দূষণের সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ে ধস নামা, মেঘ ভাঙা বর্ষণ, এসব তো তোমরা দেখতেই পাচ্ছ। এগুলো সবই ওই নিষ্ঠুরতার ফলশ্রুতি।” ঠিক কী প্রসঙ্গে অধ্যাপক মহোদয় এসব বলেছেন তা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু মাংস খাওয়া নিয়ে আইআইটি অধ্যক্ষের বক্তব্য বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের হিমস্রোত বইয়ে দিয়েছে। তাঁরা ভবিষ্যৎ ভারত নিয়ে শঙ্কিত।শঙ্কার কারণ কিন্তু আদৌ উপেক্ষণীয় নয়।

আরও পড়ুন-ইজরায়েল ফেরত ৫৩ জনের রেলভাড়া দিয়ে বঙ্গভবনে রাখল রাজ্য

লখনউয়ের ন্যাশনাল বোটানিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট চারবছর আগেই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। ১০৮টি পাপড়ি-বিশিষ্ট পদ্মের জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জিনসজ্জার অনুক্রমণ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের কাছে ১০৮টি পাপড়িবিশিষ্ট পদ্ম বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্যবাহী। সেজন্যই এই বিষয়টি বেছে নেওয়া হয়েছে। এই অভিমত সংস্থার ডিরেক্টর অজিত শাসানির। তাঁর বক্তব্য, এই জিনোটাইপটিতে পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও অ্যামাইনো অ্যাসিড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে। এর থেকে নাকি উচ্চমানের তন্তুও পাওয়া যায় আর তা বস্ত্র উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে। এ-সবের জন্যই অষ্টোত্তর শতদলকে গবেষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এই গবেষণা প্রকল্পের নাম ‘নমো ১০৮’। নরেন্দ্র মোদিই তো সংক্ষেপে ‘নমো’।

আরও পড়ুন-পুজোর নেপথ্যে সেবাইত থেকে জমিদার হওয়ার গল্প

গুয়াহাটির আইআইটি গো-বিজ্ঞানের ওপর একটি আলোচনা সভা বা সেমিনারের আয়োজন করেছিল। এর আগে তারা একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিল যেটির শিরোনাম ‘জীব উপকার তন্ত্র’। সেখানে গৃহে গোপালন কীভাবে ক্যানসার নিরাময়ে সহায়ক হতে পারে সে-বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। অপর একটি গবেষণাপত্রে আলোচ্য বিষয় ছিল পঞ্চগব্য অর্থাৎ দধি, গোবর, ঘি, দুধ এবং গোচোনার মিশ্রণ কীভাবে হৃদরোগ, স্থূলতা, কুষ্ঠ, চর্মরোগ এবং স্ত্রীরোগ নিরাময়ে সহায়ক হয়, সেটা। সেই সেমিনারে জীব উপকারতন্ত্রের সফল প্রয়োগের কোনও সার্থক দৃষ্টান্তের কথা শোনা যায়নি।
আইআইটি খড়গপুরে অফিস অফ দ্য কনসেপ্ট অফ কমপ্লিট রিলিজিয়ন (ওসিসিআর) অবস্থিত। সেখান থেকে ছাত্র ও অধ্যাপকবর্গ ২০১৬ থেকে নানাবিধ প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছেন। এরকমই একটা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে স্বস্তিকা চিহ্ন এমন একটা প্রতীক যেটায় প্রাকৃতিক নিয়ম ও বিবর্তনের সৌন্দর্য ঘনীভূত হয়েছে। এরকম আর একটি প্রতিবেদনে বেদের সূক্তের সঙ্গে আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের অসরলরৈখিকতার নীতির যোগসূত্র খুঁজে বের করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, উত্তর আধুনিক বিজ্ঞান, অসরলরৈখিক বিজ্ঞান, কোয়ান্টাম তত্ত্ব, এসবকিছু প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যাচর্চার বিষয় ছিল।

আরও পড়ুন-সুপ্রিম ধাক্কায় রাজ্যপাল আরও নমনীয়, ৭১ বন্দিমুক্তি

পিছিয়ে নেই দিল্লির এইমসও। সেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ভারতীয় শাস্ত্র নিয়ে রীতিমতো চর্চা চলছে। বিশ্বাস, আরোগ্য আর স্বাস্থ্য, এদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।
সব দেখেশুনে গৌতম মেননের মতো পদার্থবিদ্যা ও জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক তথা সোনিপথের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন বলছেন, গোটা প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানমনস্কতার, বৈজ্ঞানিকসুলভ নৈতিকতা এবং বিজ্ঞানের যথাযথতার কোনও অবকাশ নেই। সেটাই দুঃখজনক।
অনেকে বলছেন, আমাদের দেশে বিজ্ঞান পড়ানো হয় বটে তবে বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে তা বোঝানো হয় না। সেজন্যই এই নয়া ধারা চালু হওয়ার সুযোগ পেয়েছে মোদি জমানার আশকারাতে।

আরও পড়ুন-শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য জানতে সমীক্ষা করবে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ

আবার কারও অভিমত, মধ্যমেধার চাষ আর স্বজনপোষণ তো ২০১৪-তে শুরু হয়নি। তার আগে থেকেই কমবেশি সেটা চালু ছিল। আর এখন যা ঘটছে সেটা সেসবেরই চূড়ান্ত পরিণতি।
সাংস্কৃতিক রূপান্তরের নামে ভারতের বিজ্ঞান সংক্রান্ত উৎকর্ষ কেন্দ্রগুলোতে যা ঘটছে, সেই ঘটমান বর্তমানের প্রেক্ষিতে একটা কথাই জোর দিয়ে বলা যায়।
যা হচ্ছে সেটা মোটেই ভাল হচ্ছে না।

Latest article