এ সাগর ভালবাসা

অবিরাম, অবিচল ঢেউ। সাগরের কাছে এসে ক’জন মানুষ সেই কল্লোলের উৎসবের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তা সত্যিই গবেষণার বিষয়।

Must read

শুভায়ু দে

(১)
অবিরাম, অবিচল ঢেউ। সাগরের কাছে এসে ক’জন মানুষ সেই কল্লোলের উৎসবের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তা সত্যিই গবেষণার বিষয়। একটা অদ্ভুত টান আছে, এখানে খুচরো জিনিস হারিয়ে যায়, শুধু আলোর খোঁজ করে মন, আর নিজের অজান্তেই বলে ওঠে, ‘আর কত?’ কত দূর সেই সীমানা, চোখের পরিমাপ যেখানে শেষ হয়ে যায়, সেখানে কি শুরু আরেক মহাদেশের; জলের মহাদেশ? সমুদ্রের কাছে আসার আগে অনেক হিসেব কষে আপনি যদি মনে করেন, ‘নাঃ চুল ভেজাব না।’ সেটি ভুল। চুল না ভেজান আঙুল ছোঁয়াবেন, পরিমাপ নিতে চাইবেন জলের গভীরতার। আঙুলের সেন্সরে প্রতিধ্বনিত সে ধ্বনি হৃদধ্বনিতে সংসৃত হয়ে ভাসায় মানুষকে। এটাই তো টান। এই টানটাই তো চেয়েছিলেন হৃদয়বাবু তার পাশের মানুষগুলোর কাছ থেকে, পাননি।

আরও পড়ুন-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আলো ও অন্ধকার

পেশায় তিনি ছোট উকিল। এ নামের মানে খুঁজতে যাবেন না। এটা উপহাস। সবাই তো সবাইকে উপহাসই করে এখন। টিপ্পনীতে যে সুখ আছে তা শরীর-প্রেমেও নেই। আসলে উনি ল-ক্লার্ক। সারাদিন নানা মানুষ, তাদের নানা সমস্যার কথা শুনতে পান। বেশ কিছু ক্ষেত্রে তো উনি তো উকিলের অনুপস্থিতিতে অনেক সমস্যারই সাঁঝবাতি হয়ে ওঠেন। তাঁর কাছে এ আদালত চত্বর একটা বিরাট সাগরের মতো লাগে। মানুষের ঢেউ সারাদিন, তাদের প্রত্যেকের জীবনেও একেক সমস্যার ঢেউ। কম তো বয়স পেরলো না। ৪০ বছরের কর্মজীবন। তিনি এখন তাই এই ঢেউ-এর দেশের স্কুলমাস্টার। জমি-মোকদ্দমা, নোটারির পাতাগুলোর সাইজ অবশ্য তিনি যে বড় টেবিলে বসেন তার চেয়ে। চুঁচুড়া কোর্ট; লম্বা দালানের এদিক-ওদিক ছিটিয়ে বসে টাইপিস্ট-ল-ক্লার্ক, ইন্টার্ন ল-ইয়ার আর সর্বোপরি উকিলমশাইদের আনাগোনা।
চোখের চশমাটায় কে জানে দেখতে পান কিনা! গালিও শুনতে হয়, ‘এ কী গো, দাদা এত বয়স হয়ে গেল, তাও এসব ভুল করছ!’ ভুল করছেন না ভুল হচ্ছে তার সাথে তিনি এখনও সেটাই ধরতে পারলেন না। এক ছেলে, বউ নিয়ে আলাদা থাকে। তিনি আর স্ত্রী থাকেন বাড়িতে। শ্রীগুরু আশ্রমের দীক্ষিত। মাঝে মাঝে ভ্রাতৃসংঘ, মাতৃসংঘ এসব করে বেড়ান। তবু কেন টান পান না।
রবিবার-রবিবার করে লাফিং ক্লাব। হাসলে হার্ট ভাল থাকে। তার ইচ্ছে ছিল না, কে যেন তার স্ত্রীর মাথায় ঢুকিয়েছে, অগত্যা। না মানলে বলবে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার তো কোনও দাম-ই নেই এ-বাড়িতে।’
অবশ্য দাম দিতে হয় না লাফিং ক্লাবে, রোটারি ক্লাব থেকে ফ্রিতে শেখায়। তবে ওঁর মনে হয় জোর করে বোধহয় কাউকেই হাসানো যায় না।

আরও পড়ুন-বইমেলার ছবি

গত রোববারটা ভাল যায়নি। সুধীরবাবু মারা গিয়েছিলেন সকাল দশটা নাগাদ। ওঁরা ব্যায়াম করছিলেন, এমন সময় খবর আসে। এভাবেই একদিন চলে যেতে হবে। তার টেবিলে আসবে অন্য মানুষ, অন্য মোকদ্দমার ফাইল। সেই ক্লান্তিহীন ঢেউয়ের সংযাত্রী হয়ে আরেক জলের বাগানে এসে পড়বেন? মাঝে কী এই হাসির ক্লাব সেই মেটামরফোসিস!
(২)
‘কাল তো শেষ দিন। ওদের তো কিছু খাওয়াতে হবে।’ গিন্নি মনে করান।
‘হ্যাঁ গো, অর্ডার দিয়ে এলাম আজ সূর্য মোদকে। ওরা সব জলভরা ভালবাসে।’
একটু থেমে নিয়ে মুখে একটা হাসি টেনে বলেন, ‘তা’লে কাল সব শেষ। এবার ভাবছি রমেনের ওষুধের দোকানটাতে একটু গিয়ে বসব। দেবে কিছু অল্প যা হোক। আমাদের তো খাইখরচ বেশি নেই। আর তুমি তো ফলস পাড়, পিকো এ-সবের কাজ জানোই। বাড়ি বসে করে দাও, ওতেই হয়ে যাবে…কী বল?’
‘সে সব দেখা যাবে’খন। চল না একটু পুরী ঘুরে আসি। ধৌলি ধরে যাব, দু’দিন থাকব, গুরুদেবের আশ্রমে থেকে যাব। বুক করে দিতে বলব পিনকাইকে। আবার ধৌলি ধরে ফিরে আসব’খন। কম পয়সায় হয়ে যাবে’— গিন্নির আবদার।

আরও পড়ুন-এআই যেন নতুন আঙ্গিকের এক কবিতা

‘টাকাটা ব্যাপার না। কিন্তু জানো তো, এখন আর কোথাও ভাল্লাগে না। এই কাজ যা করতাম তা ওই অভ্যাস হয়ে গেছে বলেই… ওটাও যে খুব ভাল্লাগত তাও না।’
‘তোমার তো কিছুই ভাল্লাগে না। আমারই সব জ্বালা…’ গিন্নির দোষ নেই। আরও কিছু বলছিলেন গিন্নি, খবরের কাগজটা নিয়ে তাই উঠে বারান্দায় চলে গেলেন যাতে এড়ানো যায়।
আসলে কী যে হয়েছে তা নিজেও জানেন না। কিছুতেই তো সমস্যার বৈতরণী পার করতে পারছেন না। আকাশকুসুম শুধু ভেবে ভেবে অস্থির হচ্ছেন।
‘পিনকাইকে বলো কবেকার টিকিট আছে। তা’লে দুটো কেটে নিতে আর ঘর বুক করতে। আর আমি বাজারে যাচ্ছি, গরম জল বসিয়ে রেখো, চান করে তাড়াতাড়ি বেরোব।’
উনি জানেন কীভাবে সংসার সামলাতে হয়। তাই এই কথা বলে হনহন করে সাইকেলের ঘন্টিটা বাজিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

আরও পড়ুন-​দরিদ্র-মেধাবীদের ১৫০০ কোটির বৃত্তি রাজ্যের

(৩)
পুরীর শ্রীগুরু আশ্রমটা ভাল, ছশো টাকা ঘরভাড়া। ভাল চলে যাবে দু’দিন। পুরী এসেছিলেন সেই যৌবনে, আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে। কিচ্ছু মনে নেই, এখন আর শুধু পুরী হোটেল নেই। অনেক অনেক মানুষ, হাসছে, খেলছে। ঢেউ দেখছে, জলের ওপর বাচ্চারা ঝাঁপাচ্ছে। দুপুরে এসে পৌঁছেছেন, একটু খেয়ে মন্দিরের দিকটা যাবেন। সেই ‘কাকাতুয়া’ না কী একটা যেন ছিল। খাজা পাওয়া যায়। স্ত্রীর মুখ চেয়ে এসেছেন। কীই-বা করবেন, অবসর হয়ে গেছে। এখন কিছুই যেন মন টানে না। উনি যে কাঠের চেয়ারে বসতেন, সম্মানার্থে ওনার নাম লিখে দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে শেষদিনে, রং দিয়ে। এই একটা জিনিস বড় ভাল লেগেছিল তার। কত লোককে মুশকিল থেকে হাজারবার বার করছেন তিনি, অথচ নিজের বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পারলেন না। মনোজিৎ ওঁর বন্ধু, তার ভাই কলকাতার কোর্টের জাঁদরেল উকিল। সেই ভাই কায়দা করে তার দাদার জমির পরচাগুলো নিজের নামে করে নিয়েছিল। অনেক ভাল ভাল উকিলের কাছে দৌড়াদৌড়ি করলেও ব্যবস্থা করতে পারেননি কারণ জমিটার ম্যাপে অনেক ভুল ছিল। আইনের মারপ্যাঁচে জিতে গেল মনোজিৎ-এর ভাই। সেই দুঃখেই অকালে চলে গেল মনোজিৎ। হৃদয়বাবু ভেবেছিলেন তিনি মনোজিৎ আর নমিতার মেয়ের সাথে নিজের ছেলের বিয়ে দেবেন। কিন্তু হল না। কত ভাল মেয়েটা ছিল, প্রতিমার মতো মুখটা। নমিতা যদিও বলেছিল, ‘আরে দাদা, সব ভাগ্য, সব ভগবানের খেলা।’ অবশ্য এই কথাটায় নিজে কোনওদিন সন্তুষ্ট হতে পারেননি তিনি।
‘যাবে তো?’ স্ত্রীর কথায় তাকান।
‘হ্যাঁ চলো। আগে মন্দিরের দিকটা ঘুরে আসব। আসার সময় আবার খাজা নিতে হবে। মনে কোরো কিন্তু।’

আরও পড়ুন-টাটার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভারতে চপার বানাবে এয়ারবাস

(৪)
বালিয়াড়ির একটা কোণে বেঞ্চে বসে আছে ওরা দু’জন।
এই হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। সুখের অঙ্ক মেলাতে পারছেন বোধহয় এবার। সব মনে পড়ছে, গোঘাট থেকে যেই মেয়েটা এসেছিল, স্বামীর সাথে ডিভোর্সের মামলা চলছিল। মেয়েটার গায়ে হাত দিত, ছেলেটার চরিত্র ভাল না। কেসটা জিতে যাওয়ার পর ওকে এসেও জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। কিন্তু উনি তো শুধু একটা কোর্ট স্ট্যাম্পে কাজ করে দিয়েছিলেন। কাজ তো করেছে উকিলে, তবু ভাল লেগেছিল। হয়তো নমিতার মেয়েটার জন্য অপরাধবোধ কাজ করেছিল। যদিও দোষ তার ছিল না, ছেলের দোষ। তবুও বাবা হওয়ার জ্বালা। তাই বোধহয় ওই মেয়েটা যখন কেঁদেছিল, তিনিও চোখে জল ধরে রাখতে পারেননি।
জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি সত্যিকারের সাগরের মুখোমুখি। কোথাও শুনেছিলেন, সাগর সব নাকি ফিরিয়ে দেয়। সুখ ফিরিয়ে দিচ্ছে আজ।
হাসির আগে একটু কান্না পাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে এই কান্নাটা জমে ছিল বলেই হাসতে পারেননি অ্যাদ্দিন। একটু কি কাঁদবেন উনি…
অঙ্কন

Latest article