শেষ পাতা অনুভূতি অশেষ

‘সমুদ্রের কিনারে বসে, জল বিনে চাতকী ম’লো’, লালনের লেখা গানটি অতনু ঘোষের সাম্প্রতিকতম ছবি ‘শেষ পাতা’র শেষ গান। কিন্তু তার অনুভব ছবির গণ্ডি ছাপিয়ে পৌঁছে যায় জীবনে। সেই জীবন যা আমরা নিত্য যাপন করে চলেছি। সেই জীবন যা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে কিন্তু পৌঁছতে দেয় না! আমার ‘আমি’কে খাঁচা-বন্দি রেখে বড়জোর পৌঁছে দিতে পারে সমুদ্দুর কিনারে কিন্তু তাতে তৃষ্ণা মেটে কই! এই অনুভব যিনি অভিনয়ে মেলে ধরেছেন, তিনি এক ও অদ্বিতীয় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। জানাচ্ছেন প্রীতিকণা পালরায়

Must read

কী ভীষণ ব্যক্তিগত কিন্তু কী অভূতপুর্ব সার্বিক। এক বাক্যে যদি ‘শেষ পাতা’ দেখে আসার অনুভূতি লিখতে বলা হয়, এটাই প্রাথমিক মনে হওয়া। এক ব্যক্তি মানুষের জার্নি, সেটা একান্তই তার থাকলেও, যাত্রাপথের সঙ্গে অজান্তেই একাত্ম হয়ে যাওয়া, এক অনিন্দ্য অনুভূতি। ‘শেষ পাতা’য় দর্শক বাল্মীকির গল্প দ্যাখে কিন্তু নিজের কথা ভাবে! এই যুগলবন্দি যা কিনা ফল্গুর মতো নীরব ও গোপন, তাকে নিয়ে খেলার যে পারদর্শিতা, পরিচালক অতনু ঘোষ যে এই প্রথম প্রমাণ করলেন তা নয়, তাঁর ছবিতে বরাবরই এক শান্ত, নরম, নীরব অনুভূতির সমাহার থাকে যা ছবি শেষেও সঙ্গী হয়। ‘শেষ পাতা’ও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যা ব্যতিক্রম তা শ্রী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। নিজের অভিনয়সত্তাকে ভাঙচুর করার যে খেলায় তিনি মেতেছেন তা ভীষণরকম ব্যতিক্রমী। মেনস্ট্রিম ছবির সিংগলস্ক্রিন ‘হিরো’ থেকে মাল্টিপ্লেক্স-এর ‘নায়ক’ হয়ে এই মুহূর্তে সব ধরনের প্ল্যাটফর্মে ভার্সেটাইল ‘অভিনেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার এই নিবেদিত পরিশ্রম কুর্নিশ করার মতোই। অতনু তাঁর প্রিয় অভিনেতাকে সেই সুযোগ আরেকবার করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক ওয়েব সিরিজ ‘জুবিলি’তে শ্রীকান্ত রায়ের চরিত্রের সঙ্গে ‘শেষ পাতা’র বাল্মীকি চেহারায়, চরিত্রে এতটাই বিপরীতধর্মী যে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আরও পড়ুন-ইডি ডিরেক্টরের মেয়াদবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের

একমুখী গতির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে যেমন গতিহীনতার ভ্রম হয় কিংবা কিংবা অনন্ত নৈঃশব্দ্য যেমন কোনও কোনও সময় ভীষণ রকম বাঙ্ময় হয়, ছবির প্রতিটি চরিত্রের নড়াচড়া, কথাবলা, কার্যক্রম চোখের সামনে ঘটে যেতে থাকলেও এক স্থবিরতা মনকে গ্রাস করে। এক নিরানন্দ যাপনে মন অভ্যস্ত হয়ে যায়। এমনিতেই অতনুর ছবিতে চরিত্রের ভিড় তেমন থাকে না। কিন্তু কতিপয় চরিত্ররাই সমকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয়। এই যে ‘শেষ পাতা’র একান্ত যাপন, এ-ও তেমনই। দর্শক তাঁর সমাজ, সময়, সভ্যতার নাগপাশ সমেত অতনুর ছবিতে ঢুকে পড়তে পারেন। ‘রিলেট’ করতে পারেন। ‘শেষ পাতা’র গল্প তাই এত মন ছোঁয়া। একটি দৃশ্যে যেমন প্রকাশনা সংস্থার এক কর্মীর সঙ্গে লোন রিকভারি এজেন্টের কথাবার্তা এক লহমায় মনে করিয়ে দেয় আমাদের অধিকাংশের জীবনেই ‘ইএমআই’-এর ভূমিকা! কখনও আকাঙ্ক্ষা, কখনও প্রয়োজনীয়তা, ঋণ গ্রহণ ও তা পরিশোধ এই সমাজের রোজনামচা হয়ে গেছে আমাদের অজান্তেই। অতনু এই ছবিতে তা এমন সুচারু রূপে বুনেছেন যে গল্প আর গল্প থাকেনি, বাস্তব হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন-ব্যর্থ বিজেপি, মণিপুর নিয়ে সরব তৃণমূল

একসময়ের ডাকসাইটে লেখক বাল্মীকি জীবনসায়াহ্নে নিঃসঙ্গতার শিকার। তার রাইটার্স ব্লকের একাধিক ধাপ আছে, যথাযোগ্য কার্যকারণও আছে। সেসব খানিক অন্ধকারময়। খানিক সমাজের দান! বাল্মীকির অভিনেত্রী স্ত্রীকে কেউ বা কারা খুন করে নগ্ন অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়েছিল ময়দানে। সে এক অধ্যায়। এখন অন্ধকারময় অধ্যায় অনেকেরই থাকে কিন্তু তা নিয়ে যদি বই ছাপানোর পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে ব্যাপারটা অন্য মাত্রায় যেতে বাধ্য! বাল্মীকির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অগ্রিম বাবদ প্রকাশকের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিল সে কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে সে মাতাল, অসামাজিক, অসফল মানুষে পর্যবসিত। কাজেই তার থেকে পারিশ্রমিক উদ্ধারে প্রকাশক এক বিচিত্র পথ নেয়। বাল্মীকির পিছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় এক লোন রিকভারি এজেন্টকে। গল্প এক অন্য মাত্রা পায়। এই এজেন্ট, ‘রৌণক’-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। নিঃসন্দেহে বড় পর্দায় ব্রেক বড় কথা হলেও, এমন চরিত্রে অভিনয় বিক্রম আগে কখনও করেননি, এত ভাল অভিনয়ও বোধ হয় নয়!

আরও পড়ুন-মালদহে ‘ম্যাঙ্গো সুইট’ তৈরির পথ দেখালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবিতে অভিনয়ের অন্যতম স্তম্ভ গার্গী রায়চৌধুরী। পরিণত কিন্তু পরিমিত অভিনয়ে যোগ্য সঙ্গতটা তিনিই সবচেয়ে বেশি করেছেন। ‘মেধা’র জটিল চরিত্রটি যেভাবে তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তা অনবদ্য। রায়তি ভট্টাচার্যের অভিনয়ও ঝরঝরে। তবে ফের ফিরতে হয় প্রসেনজিৎ প্রসঙ্গেই! ছবিতে তাঁর লুক নিয়ে চর্চা অনেক আগে থেকেই চলছিল। সোমনাথ কুণ্ডু আর একবার তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন প্রসেনজিৎকে বাল্মীকি তৈরি করতে গিয়ে। এতটাই বিশ্বাসযোগ্য দেখাচ্ছে— তারকাকে না দেখলে বোঝার নয়। তবে সবটাই তো মেকআপ নয়, শীর্ণতা, গালের খোঁচা দাড়ি’র সঙ্গে চোখের মরা চাহনিটা অভিনেতাকেই আনতে হয়েছে! সৌমিক হালদারের ক্যামেরা কলকাতাকে দুর্দান্ত দক্ষতায় ফ্রেম-বন্দি করেছে। দেবজ্যোতি মিশ্রের সুর ভীষণই মন ছোঁয়া। তৃষ্ণা মেটাতে চাওয়া কিন্তু না-মেটা চাতক পাখির হাহাকার তাঁর সুরের কারণেই তো মস্তিষ্কে বসে যায়!

Latest article