অনাস্থা ভোটে জেতার অর্থ দেশের আস্থা অর্জন নয়

ভারতীয় গণতন্ত্র আজ বিপন্নতার মুখোমুখি। সংসদে যেসব কাণ্ড ঘটে চলেছে, সেগুলি তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। লিখছেন তানিয়া রায়

Must read

আজ একই সঙ্গে দেশের দুই প্রান্তে আগুন জ্বলছে। মণিপুরে ও হরিয়ানায়। এক রাজ্যে জাতির ভিত্তিতে, অন্য রাজ্যে ধর্মের ভিত্তিতে সংঘর্ষ অব্যাহত।
অন্য কেউ নন, প্রাক্তন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক বলছেন, অপেক্ষায় থাকুন। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, এমন ঘটনা আরও বাড়বে। তাঁর আশঙ্কা, ২০২৪-এর ভোটে জয়ের জন্য যে কোনও সীমা বিজেপি অতিক্রম করবে।
সত্যপাল বলছেন, ‘ওরা নিজেরাই নির্মীয়মাণ রাম মন্দিরের উপর গোলা ছুঁড়তে পারে, বিজেপির বড় কোনও নেতাকে খুনও করিয়ে দিতে পারে। এ-ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ-যুদ্ধ বিতর্ক তো রয়েইছে।’ তাঁর আশঙ্কা, এমন একটা ঘটনা বিজেপি ঘটাবে, যার ফল ভোগ করবে গোটা দেশ। আর তার উপর ভর করেই বিজেপি উতরে যাবে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন।
অটলবিহারী বাজপেয়ী বলতেন, সব বিষয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। সেটাই গণতন্ত্র (Indian democracy)। অথচ মণিপুর ইস্যুতে বারবার আলোচনা চেয়েও ফিরে যেতে হয়েছে বিরোধীদের। কারণ একটাই, গেরুয়া আস্তিনে রক্তের দাগ লেগে যাওয়ার ভয়। হিংসায় যদি রাষ্ট্রের ভূমিকা না থাকে, তা হলে আলোচনায় ভয় কেন? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকাটা জরুরি। সাফল্য বা ব্যর্থতা মাথা পেতে নেওয়াটাও সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার শ্রেণিতেই পড়বে। বাজপেয়ীজি তা-ই শিখিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু ব্যর্থতা যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়? ভয় ঘিরে ধরবে তখনই। সেই মুহূর্তে পিছু হটবে শাসক। বধ্য হবে সে সামান্য মুষলে, পাশুপতের প্রয়োজন তখন আর হবে না। এসব আমরা জানি। আমরা এটাও জানি, এই অনাস্থা প্রস্তাবের পরিণতি কী।
এতদিন মৌন থেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। এবার প্রধানমন্ত্রী বলবেন। নিয়মের জাঁতাকলে তিনি বলতে বাধ্য। হয়তো মোদিজি আক্রমণ করবেন বিরোধীদের। নীতিকথা শোনাবেন। জাহির করবেন, রাষ্ট্রকে কীভাবে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। মণিপুর ইস্যু হয়তো তাঁর জবাবি ভাষণের গা-ঘেঁষে বেরিয়ে যাবে। তা-ও তিনি বলবেন।
গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো রক্ষার লড়াই চলছে নিরন্তর। এর আগে শাসক দলের কেউ কখনও সংসদে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দেননি, চুপ! না হলে ঘরে সিবিআই পাঠিয়ে দেব। আজ সংসদে দাঁড়িয়ে সেই কথাই অন রেকর্ড বলছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। বিরোধীদের কথা বলার অধিকারে সরাসরি কুলুপ এঁটে দেওয়া হচ্ছে এজেন্সি নামক অস্ত্র দিয়ে।

আরও পড়ুন- অমর্ত্য সেনকে উচ্ছেদের নোটিশে নিম্ন আদালতেও স্থগিতাদেশ

অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এখন শাসকের তাঁবেদার। বিরুদ্ধে খবর করলে আয়কর বা ইডি হানা দিচ্ছে অফিসে। হুমকি আসছে, পরিস্থিতি যেন সিদ্দিক কাপ্পান বা তিস্তা শেতলাবাদের মতো না হয়ে যায়। বিভাজনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গেলেই রাতারাতি একজন সমাজকর্মী বা সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছেন আরবান নকশাল। এই সরকারের স্পষ্ট বিধান, অপদার্থতা জারি থাকুক। দেশ ক্ষয়ে যাক তলায় তলায়, আর উন্নয়ন বেঁচে থাকুক ‘মন কি বাত’-এর ভাষণে। দেশে-বিদেশে হবে তার ফলাও প্রচার। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার অনাস্থার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৫ বার। কোনওবার বিরোধীরা তাঁর সরকার ফেলতে পারেনি। অনাস্থার সেই রেকর্ড মোদিজি ভাঙতে পারবেন না। ১৩ দিন বা ১৩ মাসের সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারেননি অটলবিহারী বাজপেয়ী। কিন্তু অর্জন করেছিলেন আস্থা। মানুষের। তাই ১৯৯৯ সালে ভোটে জিতে এসেছিলেন ক্ষমতায়। আস্থা অর্জনের সেই রেকর্ডও মোদিজি ছুঁতে পারবেন না। হরিয়ানা বা মণিপুরের মতো হতে চায় না দেশ। এই সারসত্যটুকু বুঝেও বুঝতে চাইছেন না নরেন্দ্র মোদি। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত।
সরকারের উদাসীনতায় আর বিভেদকামিতায় উত্তপ্ত হচ্ছে বাতাস, রক্তাক্ত হচ্ছে মাটি। নিরাপত্তা বাহিনীও তাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না মণিপুর কিংবা হরিয়ানা। মানুষের আস্থার পাঁচিল সেখানে ভাঙছে রোজ, লুট হচ্ছে অস্ত্রভাণ্ডার, চলছে মৃত্যুমিছিল। সরকার আসবে, যাবে। জোট গঠন হবে, ভেঙেও যাবে। কিন্তু নেতির এইরকম বিস্তারে, অবিশ্বাস আর অযত্নের এই আবহে, এই দেশ কি থাকবে? দেশের গণতন্ত্র কি মাথা উঁচু করে সর্বদা অস্তিত্ব জাহির করতে পারবে?
নীরব মোদির ভাষণে কিংবা নিছক পাটিগণিতের অঙ্কে অনাস্থা প্রস্তাব পরাস্ত হলেও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কিন্তু পাওয়া যাবে না। যাচ্ছে না।
কারণ, আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সংসদও পৃথিবীর অন্যান্য কর্তৃত্ববাদী সংসদগুলিকে অনুকরণ করতে শুরু করেছে। যথারীতি তারা আইনও পাশ করছে, বৈধতার পরীক্ষায় সেগুলির উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা-অযোগ্যতার তোয়াক্কা না করেই।
এটাই আমাদের পক্ষে আতঙ্কের কথা, আশঙ্কার বার্তা।

যেমন, অনুচ্ছেদ ২৩৯এ-এ দিল্লির জন্য বিশেষ বিধান দিয়েছে। উপ-অনুচ্ছেদ (৪) বলছে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন প্রধান হিসেবে, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, সংবিধান দিল্লির জন্য একটি প্রতিনিধিত্বমূলক এবং সংসদীয় সরকার গঠনের কথা ভেবেছিল। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি অব দিল্লি-কে (জিএনসিটিডি) একটি পুরসভা বা গুরুত্বের দিক থেকে তার চেয়েও ছোট কিছু একটি করার জন্য হাজারো প্যাঁচ কষে চলেছে। এবারই এমন একটি বিল পাশ হল, যার মাধ্যমে সরকারি অফিসারদের উপর মন্ত্রীদের যাবতীয় কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা চলে গেছেন সরাসরি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের তাঁবে। তার ফলে, লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং তাঁর অধীন সরকারি অফিসারদের করুণার পাত্রের স্তরে নেমে যাবেন বেচারা মন্ত্রীরা, তাঁরা কেবল শোপিসসম শোভা দেবেন।
এই ভারত ক্রমশ গণতন্ত্রের (Indian democracy) বধ্যভূমি হয়ে উঠছে।

Latest article