গান ভালবেসে গান

পুজোর গান মানেই তখন ডাকসাইটে শিল্পীদের গাওয়া রেকর্ড। সেই তালিকায় ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম চালু করেছিল সেই রেওয়াজ। পুজোর গানের রেকর্ড তখন একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। তারপর শতবর্ষ অতিক্রান্ত। রেকর্ড প্লেয়ার, ক্যাসেট, অডিয়ো সিডির যুগ পেরিয়ে এখন অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে নতুন পুজোর গান। অ্যালবাম নয় এখন সিঙ্গলের যুগ। বছরভর রিলিজ। তাও পুজোর গানের অ্যালবাম একটা উন্মাদনা। আজও সেই নস্টালজিয়াতেই বুঁদ শিল্পীরা। পছন্দের সেরা দশটা গান আর প্রথম পুজোর অ্যালবামের অনুভূতি নিয়ে বললেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীরা। শুনলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

রূপঙ্কর বাগচি
সেরা পছন্দের গান
নয়ন সরসী কেন || কিশোরকুমার
আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা || হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
একটা গান লিখো আমার জন্য || প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়
মনে পড়ে রুবি রায় || রাহুল দেববর্মন
পোড়া বাঁশি শুনলে এ মন আর থাকে না || আশা ভোঁসলে
ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে || মান্না দে
কী দেখলে তুমি আমাতে || মান্না দে
দেখে যা অনির্বাণ || নচিকেতা
ও গানওয়ালা || কবির সুমন
শোনো কোনও একদিন || হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
১৯৯৫ সালে আমার প্রথম পুজো অ্যালবাম বেরোয়। আটলান্টিক মিউজিক থেকে ‘তুমি শুনবে কি’। এই অ্যালবামে ছ’টা গান ছিল যা আমার নিজের লেখা ও সুরে। অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছিলেন। প্রথম কাজের স্মৃতি খুবই ভাল এবং আনন্দের তবে এই অ্যালবামটি জনপ্রিয়তা পায়নি খুব একটা। এখন তো অ্যালবাম হয় না, সিঙ্গল গান বেরিয়েছে এই পুজোয় ‘আমি তোমার মতো নই’, ‘জাগো দুর্গা’ এই দুটি গান। টাইমস মিউজিক থেকে আমি আর ইমন চক্রবর্তী একটি রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছি ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’। একটা ওয়েবসাইট থেকেও গান গেয়েছি। তবে পুজোর গান বলে এখন আর আলাদা কিছু নেই। আমাদের কমবয়সে ছিল। এখন সারা বছর অজস্র গান রিলিজ হয়। তবু পুজোর গানের একটা মাহাত্ম্য আছে।

আরও পড়ুন-দুর্গা ভারতমাতা নন, তবে পুজো উপেক্ষিতও নয়

শুভমিতা
সেরা পছন্দের গান
দূরে আকাশ শামিয়ানা || লতা মঙ্গেশকর
নাও গো মা ফুল নাও || লতা মঙ্গেশকর
এই চারুকেশে || আরতি মুখোপাধ্যায়
স্মৃতি শুধু থাকে || হৈমন্তী শুক্লা
তোমার টানে সারা বেলার গানে || রূপঙ্কর
যেও না দখিন দ্বারে || শ্রীকান্ত আচার্য
অমল ধবল পালে || রবীন্দ্রসঙ্গীত, জয়তি চক্রবর্তী
এ মন ব্যাকুল যখন তখন || নচিকেতা
দেখে যা অনির্বাণ || নচিকেতা
এই তো সেদিন || মান্না দে
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
আমার প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম নচিকেতার ‘আবিষ্কার’। ২০০১-এ রিলিজ। একদম ভাল রেসপন্স পাওয়া যায়নি। নচিদা তখন আকাশচুম্বী, তাঁর গান না শুনে আমার গান শুনবে! আমার অ্যালবাম কিনেছিল নচিদার ছবি দেখে। তারপর ফেরত দিয়ে গেছিল। ২০০৩-এ দ্বিতীয় পুজো অ্যালবাম ‘সাঁঝবেলার গান’, সেটা খুব সাড়া ফেলে দিল। অগাস্টে আশা অডিও থেকে গালিবনামা টু বেরিয়েছে। ২০১৭-এর প্রথম পার্টটা বেরিয়েছিল। শ্রীজাতর সুরে চারটে গান রয়েছে। পুজোর গান মানেই আমার কাছে লং প্লেয়িং রেকর্ড, ক্যাসেট পরবর্তীকালে সিডি কিনতাম। সব সহশিল্পীর সিডি কিনতাম, শুনতাম। তখন বছরে একবার পুজোর গান বেরোত, তার ক্রেজই আলাদা। এখন তো সারাবছর গান তৈরি হয়।

আরও পড়ুন-পুজো যেভাবে দেখলেন রবীন্দ্রনাথ

শান্তনু রায়চৌধুরী
সেরা পছন্দের গান
গোধূলি গগনে মেঘে || রবীন্দ্রসঙ্গীত
এমন দিনে তারে বলা যায় || রবীন্দ্রসঙ্গীত
দিবস রজনী আমি যেন || রবীন্দ্রসঙ্গীত
গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে || শ্যামল মিত্র
তোমায় কেন লাগছে এত চেনা || প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়
মধুমতী যায় বয়ে যায় || তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমি নেই ভাবতেই || কিশোরকুমার
ঝনন ঝনন বাজে || ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য
আমার চেতনা চৈতন্য || পান্নালাল ভট্টাচার্য
চৌদভি কা চাঁদ হো || মহম্মদ রফি
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
আমার প্রথম অ্যালবাম এইচএমভি থেকে পঁচিশে বৈশাখের সময় রিলিজ করেছিল। কবিপক্ষের অ্যালবাম মানে সেটার ইমপ্যাক্ট অগাস্ট অবধিই তার ক্রেজ থাকবে। ওই অ্যালবামটা এতটাই বিক্রি হয়েছিল যে রেকর্ড হয়েছিল। প্রতি সপ্তাহে অ্যালবামটা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। তখন কোম্পানি আমাকে অনুরোধ করে পরের বছর বাংলা আধুনিক গান গাইতে। সেই সময় রিমেক হচ্ছিল প্রচুর। দশটা গানের রিমেক করি তখন। সেই অ্যালবামের গানের নির্বাচন সবটা মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা। ওটা রিলিজ করে ’৯৬-এর অক্টোবর নাগাদ। রিলিজ করে ক্যাসেট আকারে। ওই অ্যালবামে কোনও ছবি ছিল না শুধু লেখা ছিল ‘তুমি বলেছিলে’। অ্যালবামটি দারুণ সেল হয়। পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে খুব বেজেছিল। সুপারহিট। একটা গান এ-বছর রিলিজ করেছে। কবি সুনির্মল বসুর কবিতা ‘আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে’ এটাই গান হিসেবে। সেখানে অনেক ছেলেমেয়ে গেয়েছে। কোরাসে আমার ভয়েস রয়েছে। এটা পুজো রিলিজ বলে ধরছি। ইউটিউবে দেওয়া হয়েছে সেই গান। খুব সুন্দর মান্যতা দেওয়া গেছে গানটাকে।

আরও পড়ুন-এবার পুজো মাতাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর অ্যালবাম

সৌমিত্র রায়
সেরা পছন্দের গান
এই ভবসাগর রে || অমর পাল
ও মোর তিস্তা || নির্মলেন্দু চৌধুরি
মা মাগো মা আমি এলাম || মান্না দে
আমায় চিনতে কেন পারছ না মা || মান্না দে
কী আশায় বাঁধি খেলাঘর || কিশোরকুমার
তুম ইতনা জো মুসকুরা রহে হো || জগজিৎ সিং
যাও পাখি || লোপামুদ্রা
আহিস্তা আহিস্তা || জগজিৎ সিং
যখন নীরবে দূরে || অনিন্দ্য বোস
আমায় বোলো না ডাকিতে বোলো না। রবীন্দ্রসঙ্গীত
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
আমার প্রথম অ্যালবাম ‘যাত্রা শুরু’। এটা রিলিজ করে ১৯৯৯-তে টাইমস মিউজিক থেকে। পাঁচটা গান ছিল আমার আর সুরজিতের লেখা এবং সুরে। প্রত্যেকটি গান হিট হয়েছিল। আমরা তো ভাবতেই পারিনি। তখন ছাদে বসে ভাঙা গিটার, বালতি নিয়ে কয়েকজন মিলে গান গেয়েছিলাম। সেই গান করার পর ওই জায়গায় পৌঁছে যাব সেটা ভাবনাচিন্তার বাইরে ছিল। নতুন গান এ বছর করিনি। কিছু লিখেছি সুর দেওয়া হয়নি। তবে এবার যেটা করেছি সেটা টালিগঞ্জ আদিদুর্গা মঞ্চের পুজোয় ভয়েস ওভার দিয়েছি। ওদের এ বছরের থিম সত্যজিৎ রায়। ওঁর ওপর প্রায় দশ পাতার স্ক্রিপ্টে সেই ভয়েস ওভার ওরা নিয়েছে।

আরও পড়ুন-ধর্ম যার যার, উৎসব সবার স্লোগানের জীবন্ত উদাহরণ এই তিলোত্তমার বুকে…

রাঘব চট্টোপাধ্যায়
সেরা পছন্দের গান
অখিল বিমানে || কৃষ্ণা দাশগুপ্ত
আমার মনের ময়ূরমহলে || কিশোরকুমার
আমার দীপ নেভানো রাত || কিশোরকুমার
আমি সাগরের বেলা || মান্না দে
জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই || মান্না দে
গানে মোর ইন্দ্রধনু || সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
ডাগর নয়নে || অজয় চক্রবর্তী
তেরি আঁখো কে সিভা দুনিয়ামে || মহম্মদ রফি
বল কী আছে গো তোমারই আঁখিতে || রাহুল দেববর্মন
চোখে নামে বৃষ্টি বুকে ওঠে ঝড় || আশা ভোঁসলে
দূরে আকাশ শামিয়ানা। লতা মঙ্গেশকর
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম ১৯৯৮-তে আমার প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম রিলিজ হয়। ’৯৭ সালে এইচএমভির একটা কম্পিটিশনে ফার্স্ট হই। তখন ওরা আমাকে একটা অনুষ্ঠানে গান গাইবার সুযোগ দেয়। সেই গান খুব ভাল হয়েছিল। তখন একা গিটার বাজিয়ে গান গাইতাম, আমার কোনও ব্যান্ড ছিল না। পুরো গানে শো উত্তাল হয়ে গিয়েছিল। দুটোর বদলে পাঁচটা গান গাইতে হয়েছিল। তখন ওরা আমার একটা অ্যালবাম করল যার নাম ‘ভোরের আলো’। যাতে ‘তোমার কথা ভেবে আমার রাত ভোর হয়ে যায়’ এই গানটা রয়েছে। ‘বড়ে গোলাম’ গানটা রয়েছে। সারেগামা এইচএমভির মতো একটা কোম্পানি। সারাজীবন যা আমার কাছে স্বপ্নের মতো একটা জায়গা। এই কোম্পানি ভারতবর্ষের সমস্ত নামী শিল্পীর গান রেকর্ড করেছে। সেই কোম্পানি থেকে পুজোর সময় আমার অ্যালবাম রিলিজ হবে এটা একটা বিরাট পাওয়া ছিল আমার কাছে। সেই স্মৃতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সেই গান যখন বাজত দারুণ লাগত। আমি নৈহাটির ছেলে, সেখানে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পুজো শাস্ত্রীপাড়ায় হয়। সেই পুজো একশো বছর হতে চলল। দুর্গাপুজো নিয়ে অনেক গান আছে আমার। শ্যামাসংগীত, লক্ষ্মীর পাঁচালি নিয়েও গান রয়েছে তবে এ-বছর যেটা ইউনিক তা হল, বিশ্বকর্মা পুজোর থিম সং গাইলাম রাজীব চক্রবর্তীর লেখা এবং রণদীপ ভট্টাচার্যর ভাবনায়।

আরও পড়ুন-গুড়াপে কেদারনাথ দর্শন

লোপামুদ্রা মিত্র
সেরা পছন্দের গান
নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী || হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
দিনের শেষে ঘুমের দেশে || রবীন্দ্রসংগীত
তোমাকে চাই || কবীর সুমন
দেখেছ কি তাকে ওই নীল নদীর ধারে || শুভমিতা
একদিন ঝড় থেমে যাবে || নচিকেতা
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম || নচিকেতা
যাও পাখি || লোপামুদ্রা
তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা || কবীর সুমন
আমার সারাটা দিন || শ্রীকান্ত আচার্য
প্রিয়তমা || রূপঙ্কর
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
আমার প্রথম গান রিলিজ ফেব্রুয়ারিতে। পুজোর সময় নয় কিন্ত। সেই গানটা ছিল ‘হেই গো মা দুগ্গা’। ১৯৯৬-তে। সেই গান প্রথমবার বিশ্বকর্মা পুজোর সময় কানে শুনলাম বাজছে তারপর পুজোর সময়ও অনেক জায়গায় খুব বাজত। সেই গানটা এইচএমভি থেকে বেরিয়েছিল। সে যে কী অনুভূতি মনে হয়েছিল— ওটা যেন আমি নই বোধহয় অন্য কেউ। অত্যাশ্চর্য ফিলিং হয়েছে। পুজোর সময় অ্যালবাম রিলিজ হয়েছে। এর পরবর্তীকালে ‘মুশকিল আসান’, ‘সাঁকোটা দুলছে’। এ-বছর অগাস্টে আমার গান রিলিজ হয়েছে। পুজোর থিম মিউজিক করেছি বেশ কয়েকটা কিন্তু নিজে কোনও গান করিনি।

আরও পড়ুন-দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে মহাত্মা গান্ধীর ১৫৩ তম জন্মবার্ষিকী, শ্রদ্ধার্ঘ্য মুখ্যমন্ত্রীর

শিবাজি চট্টোপাধ্যায়
সেরা পছন্দের গান
আকাশ এত মেঘলা || সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
বনে নয় মনে মোর || মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
পাখিদের ওই পাঠশালাতে || উৎপলা সেন
সাত ভাই চম্পা জাগোরে || লতা মঙ্গেশকর
দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক || হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি || মান্না দে
মধুর মধুর বংশী বাজে || সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
বাঁশবাগানের মাথার ওপর || প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়
কাজল নদীর জলে || তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পল্লবিনী গো সঞ্চারিণী || দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়
প্রথম পুজোর গানের অ্যালবাম
আমার প্রথম পুজোর গান বেরোয় ১৯৮৫ সালে। এইচএমভি থেকে বেরোল চারটে গান। দুটো গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর। দুটো গান অজয় দাসের সুরে। সেই বছরই ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ ছবিটাও রিলিজ করল। এর রেকর্ডিংও আগে হয়ে গিয়েছিল। তখনই কোম্পানি অফার করেছিল আমার গান রেকর্ড করতে চায়। আমি হেমন্তদাকে বললাম। উনি দুটো গানের সুর করে দিলেন। সেই অ্যালবামের অনুভূতি সাংঘাতিক। ছোট থেকে এইচএমভি-র পুজোর গানের বই দেখে বড় হওয়া। গানটা রেকর্ড আকারে বেরিয়েছিল। সেই রেকর্ডের যুগের শিল্পী হিসেবে নিজের নাম লেখানো আমার কাছে একটা সম্পদ। শিল্পী হিসেবে উন্নীত হলাম তখন। সে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। আনন্দ। যদিও বিরাট বিক্রি হয়নি কিন্তু রেডিওতে প্রচুর বেজেছে। আমি অনুষ্ঠানেও গেয়েছি।

Latest article