গণদেবতার লেখক তারাশঙ্কর

পুড়িয়ে দিয়েছিলেন নাটকের খাতা। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বোম্বাইয়ের আকর্ষণীয় প্রস্তাব। আজীবন থেকেছেন মাটির কাছাকাছি। লিখেছেন সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা। তিনি সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করলেন অংশুমান চক্রবর্তী

Must read

কবিতা দিয়েই শুরু
তিনি যখন মাতৃগর্ভে, তার দশ মাস আগে মারা যান বড়দা। সেই ঘটনার পরে তাঁর পরিবার শুরু করেন তারামায়ের আরাধনা। দশ মাস পরে জন্ম হয় ফুটফুটে এক শিশুর। নবজাতকের নাম রাখা হয় তারাশঙ্কর। দিনটি ছিল ১৮৯৮-এর ২৩ জুলাই। আনন্দের ঢেউ ওঠে বীরভূমের লাভপুরের জমিদার পরিবারে। বাবা ছিলেন হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। মা প্রভাবতী দেবী।

আরও পড়ুন-ত্রিপুরা ক্রিকেট সংস্থা দখলে গুন্ডামি, বেরোল রিভলভার

মাত্র ৭ বছর বয়সে কবিতা দিয়ে সাহিত্য জীবন শুরু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তখন তিনি ছাত্র। আর থামেননি। লিখে গেছেন। কাঁচা হাত ধীরে ধীরে পাকা হয়েছে। পরিণত বয়সে লিখতে শুরু করেন অন্যান্য রচনা। গল্প, উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালি ঘূর্ণি’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২-এ। তারপর একে একে প্রকাশ পায় ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’, ‘গণদেবতা’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘রসকলি’। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটগল্প-সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধ-সংকলন, ৪টি স্মৃতিকথা, ২টি ভ্রমণকাহিনি, একটি কাব্যগ্রন্থ এবং একটি প্রহসন রচনা করেছেন। ছদ্মনাম ছিল ‘কামন্দক’ এবং ‘হাবু শর্মা’।

আরও পড়ুন-সংসদে আক্রমণের ঝড় তুলতে দিল্লি যাচ্ছেন অভিষেকও

অপমান সহ্য করতে পারলেন না
কম বয়সে লেখা শুরু করেন নাটক। এক আত্মীয়-বন্ধুর মাধ্যমে সেই নাটক পাঠান কলকাতার নামকরা দলের ম্যানেজারের কাছে। যদি মঞ্চস্থ হয়। ম্যানেজার নাটক পড়েই দেখলেন না। উল্টে তারাশঙ্কর সম্পর্কে অপমানজনক মন্তব্য করলেন।
সেই অপমান সহ্য করতে পারলেন না তারাশঙ্কর। তিনি নাটকের পুরো খাতাটাই গুঁজে দিলেন উনুনে। মুহূর্তে দাউ দাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যদিও পরে লিখেছেন বেশকিছু নাটক।

আরও পড়ুন-দেশের লজ্জা বিজেপির মণিপুর, আরও এক ভয়ঙ্কর ঘটনা চেপে যায় বিজেপি সরকার

সু-অভিনেতা ছিলেন
শুধু লেখক নন, তারাশঙ্কর সু-অভিনেতাও ছিলেন। বহু নাটকে তিনি স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ‘সীতা’ নাটকে সীতা, ‘প্রতাপাদিত্য’ নাটকে কল্যাণী, ‘গৃহলক্ষ্মী’ নাটকে মেজবৌ, ‘চাঁদবিবি’ নাটকে মরিয়ম, ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ নাটকে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয়। পাশাপাশি বেশকিছু নাটকে তিনি পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যেমন ‘কর্ণার্জুন’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘বশীকরণ’, ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ ইত্যাদি নাটক।

আরও পড়ুন-দিনের কবিতা

তারাশঙ্কর-সমস্যা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চণ্ডীদাস-সমস্যার কথা অনেকেই জানেন। পদ রচয়িতাদের মধ্যে একাধিক চণ্ডীদাসের উপস্থিতি রীতিমতো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও। তিনি যখন সাহিত্যে কিছুটা খ্যাতি অর্জন করেছেন, সেই সময় প্রকাশিত হয় ‘শ্রীময়ী’ নামে একটি উপন্যাস। উপন্যাসটির লেখক শ্রীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘শ্রীময়ী’র রচয়িতা তারাশঙ্কর কিন্তু ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’র তারাশঙ্কর নন। দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। পাঠক ভুল করতে পারেন ভেবে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’র লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একটি পত্রিকায় নিজের ছবি-সহ বিজ্ঞাপন দেন। লেখেন, ‘শ্রীময়ী’র লেখক শ্রীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আমি এক ব্যক্তি নই। আলাদা। উনি থাকবেন ‘শ্রীযুক্ত’, আমি ‘শ্রীহীন’।
তারপর থেকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নাম স্বাক্ষরের সময় সত্যিই শ্রীহীন থাকতেন। অর্থাৎ নামের আগে ‘শ্রী’ লিখতেন না। প্রসঙ্গত, শ্রীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও কিন্তু সুলেখক ছিলেন। যদিও তাঁর কথা খুব বেশি মানুষ জানেন না।

আরও পড়ুন-মাতৃভাষাতেও পঠনপাঠন সিবিএসইতে

সাধারণ মানুষের কথা
তিনি ছিলেন গণদেবতার লেখক। দূরে বসে নয়, সাধারণ মানুষের দাওয়ায় বসে তাঁদের সঙ্গে মিশে তারাশঙ্কর গল্প, উপন্যাস লিখেছেন। তাই তাঁর লেখা এত প্রাণবন্ত। তিনি লিখেছেন বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের গ্রাম্য কবিয়াল, সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম সম্প্রদায়ের কথা। সাধারণ মানুষগুলো তাঁর লেখনীর গুণে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ। তাঁর বহু রচনা নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। তার মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘জলসাঘর’ ও ‘অভিযান’, অজয় কর পরিচালিত ‘সপ্তপদী’, তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’, তপন সিংহের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, বিজয় বসুর ‘আরোগ্য নিকেতন’ উল্লেখযোগ্য। অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস, বিকাশ রায়, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

আরও পড়ুন-লড়াই করছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ

প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন
একটা সময় পড়েছিলেন আর্থিক সমস্যায়। বড় সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তখন উপার্জন বলতে বাঁধা রোজগার। চল্লিশ টাকারও কম। সেই সময় কবি সমর সেনের ঠাকুরদাদা দীনেশ সেনের মাধ্যমে বোম্বাই থেকে এক কাজের প্রস্তাব আসে। বোম্বাইবাসী হিমাংশু রায়ের একজন বাঙালি গল্পকার প্রয়োজন। শুরুতেই মাইনে ৩৫০ টাকা। প্রতিবছর ১০০ টাকা করে বাড়বে। আকর্ষণীয় প্রস্তাব। কিন্তু সেই প্রস্তাব হেলায় ফিরিয়ে দিলেন তারাশঙ্কর। বললেন, ‘আমি যাব না। আমার মন চাইছে না। মনে হচ্ছে সব হারিয়ে যাবে।’

আরও পড়ুন-সম্পূর্ণ ব্যর্থ মোদি সরকার

পুরস্কার ও সম্মাননা
রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে। বছর দুই পর শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের সুযোগ হয়। সে ছিল এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসের জন্য তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং ১৯৬৭ সালে ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া ১৯৬২ সালে তিনি পদ্মশ্রী এবং ১৯৬৮ সালে পদ্মভূষণ সম্মান পান। ১৯৫৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। সভাপতি হয়েছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর।

আরও পড়ুন-করমণ্ডল দুর্ঘটনার দায় রেল কর্মীদের ঘাড়ে চাপালেন রেলমন্ত্রী

১৯৭১-এর ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি প্রয়াত হন। আজও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু পাঠকের পছন্দের সাহিত্যিক। তাঁর স্মরণে প্রতি বছর দেওয়া হয় সাহিত্য পুরস্কার। তাঁর কাছারিবাড়ি ‘ধাত্রীদেবতা’য় গড়ে উঠেছে তারাশঙ্কর-বিষয়ক সংগ্রহশালা।

Latest article