ফুলে-ফুলে

শীতকাল এলেই মরশুমি ফুলে ভরে ওঠে চারপাশ। জানেন কি এই সব ফুল শুধু পরিবেশকেই সুন্দর করে তোলে না, এদের অনেকেরই রয়েছে ঔষধিগুণ। এই সব ফুলে থাকা অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট আমাদের শরীর, ত্বক এবং চুলের জন্যও দারুণ কার্যকরী। লিখেছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

Must read

শীত মানেই মরশুমি ফুলের বাহারি নকশা-কাটা ছাদবাগান, মাঠ, প্রান্তর। চারপাশে লাল, নীল, হলুদের সমাহার। গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কারনেশন, গ্ল্যাডিওলাস জারবেরা আরও কত কী! জানেন কি এই সব ফুল শুধু শোভাবর্ধনই করে না, এদের মধ্যে অনেকেরই রয়েছে ঔষধিগুণ। যেমন গাঁদা আর চন্দ্রমল্লিকা। এই দুই ফুল গুণের আধার। শরীরের অভ্যন্তরীণ বিষয় শুধু নয়, বাইরের ত্বক, চুলের যত্নেও এই ফুল অনবদ্য।
গাঁদা

আরও পড়ুন-আজ অনাস্থা ভোট দার্জিলিং পুরসভায়

গাঁদা কম্পোজিট পরিবারের ফুল। বৈজ্ঞানিক নাম টাজেটস ইরেক্টা। গাঁদার অনেকরকম জাত, যেমন ইনকা গাঁদা, গোল্ডস্মিথ, ম্যারিয়েটা, ইয়েলো সুপ্রিম ইত্যাদি। ফরাসি গাঁদা খানিকটা কমলা-হলুদ রঙের হয়। এ ছাড়া রয়েছে বড় গাঁদা, রক্ত গাঁদা, চাইনিজ গাঁদাও— যা খুব পপুলার। বাগানপ্রেমীদের খুব পছন্দের। গাঁদা যেন আমাদের জীবনের অঙ্গ। বাড়ির অনুষ্ঠান, বিয়েবাড়ি সাজাতে, পুজোআর্চায়— সবেতে গাঁদা কমবেশি লাগে।
গাঁদায় রয়েছে বেশকিছু রাসায়নিক উপাদান যা খুবই উপকারী। যেমন টার্পিনয়েড, এস্টার, ফ্ল্যাভানয়েড, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি, লাইকোপিন। আর রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি,অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও শক্তিশালী অ্যান্টিসেপটিক উপাদান। গাঁদা অ্যাস্ট্রিনজেন্ট হিসেবে খুব কার্যকরী। আয়ুর্বেদে গাঁদার ব্যবহার রয়েছে।

আরও পড়ুন-নিয়োগ দুর্নীতিতে বিজেপিও

অম্বল, অজীর্ণ, আমাশা বা রক্ত-আমাশা ও পেটখারাপে গাঁদাপাতার রস খুব কার্যকরী। দেড় থেকে দু-চামচ গাঁদাপাতার রস সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দু’ থেকে তিনবার খেলে পেটের রোগের দ্রুত উপশম হয়।
অর্শের যন্ত্রণায় অনেকেই কষ্ট পান, বিশেষ করে যাঁদের খুব কোষ্ঠকাঠিন্য রয়েছে। কারও কারও রক্তপাতও হয়। এই ক্ষেত্রে একচামচ গাঁদাফুলের রস একটু মাখনের সঙ্গে মিশিয়ে পরপর কয়েকদিন খেলে যন্ত্রণা, রক্তপড়া দুই বন্ধ হবে।
মলের সঙ্গে বা বমির সঙ্গে রক্ত এলে গাঁদাপাতার রস গরম করে তারপর ঠান্ডা করে রোজ দু’ থেকে তিন চামচ খেলে উপকার পাবেন।
চোখ লাল হলে এক চামচ গাঁদাফুলের রস অল্প জলে মিশিয়ে সেই জল দিয়ে চোখে ঝাপটা দিলে উপকার পাবেন।

আরও পড়ুন-বিজেপির মিথ্যা রাজনীতি

গবেষণা থেকে দেখা গেছে গাঁদাফুলে বেশ কিছু সক্রিয় ও উপকারী প্রদাহ-বিরোধী উপাদান রয়েছে যা ফ্রি-রেডিক্যালসের ক্ষতিকারক প্রভাব দূর করে, নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে।
দীর্ঘদিন ঠান্ডালাগা বা সর্দিকাশিতে ভুগলে গাঁদার ফুলের পাপড়ির রস খুব উপকারী। গলাব্যথাতেও খুব কার্যকরী এই ফুলের রস।
এই ফুলের মধ্যে রয়েছে গ্লাইকোপ্রোটিন এবং নিউক্লিওপ্রোটিন যা ত্বকের কোষ তৈরিতে সহায়তা করে।
গাঁদাফুলের চা নিয়মিত পান করলে মুখের ব্রণ দূর হয়, হজমশক্তি বাড়ায়, হাড়ের ক্ষয় রোধ হয়, আর্থ্রাইটিস দূর হয়। গ্যাসট্রিক আলসারের জন্য ভাল, পিরিয়ডের ব্যথা কমায়।
এই ফুলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভানয়েড যা ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি প্রতিহত করতে সক্ষম। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
গাঁদাফুল শুকিয়ে পুড়িয়ে নিন। ওই ছাইটা দিয়ে নিয়মিত দাঁত মাজুন, এতে দাঁতের গোড়া শক্ত হয়, মুখের ঘা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
গাঁদাফুল বেটে নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মাথায় দশ থেকে পনেরো দিন লাগালে মাথার খুশকি দূর হয় এবং চুল কালো হয়।
গাঁদাফুল হল প্রাকৃতিক ক্লেনজার। গাঁদাফুল শুকিয়ে গুঁড়ো করে রেখে দিন একটা শিশিতে। এবার কাঁচাদুধের সঙ্গে বেটে পেস্ট করে মুখে মাখুন। দশ মিনিট পরে তুলে ফেলুন, এতে ত্বক খুব পরিষ্কার হবে।

আরও পড়ুন-ক্যামেরাবন্দি করে টেটের ইন্টারভিউ

গাঁদাফুলের পাপড়ি ত্বকচর্চায় নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বকে বয়সের বৃদ্ধি রোধ করে। এই ফুলের রস কোলাজেন উৎপাদনে সহায়ক। ত্বক টানটান এবং বলিরেখা-মুক্ত করে।
ত্বকে ইনস্ট্যান্ট গ্লো আনতে আধকাপ গাঁদা ফুলের পাপড়ি, চারচামচ গোলাপজল, দু-কোয়া আপেল একসঙ্গে পেস্ট করে মুখের ত্বকে মাখুন। দশ মিনিট রেখে হালকা গরম জলে ধুয়ে ফেলুন।
চন্দ্রমল্লিকা
শীত ঋতুর সৌন্দর্যে আর এক নাম চন্দ্রমল্লিকা। ইংরেজি নাম ক্রিসেনথিমাম। বৈজ্ঞানিক নাম ক্রিসেনথিমাম ইডিকাম। সূর্যমুখী পরিবারের উদ্ভিদ এই চন্দ্রমল্লিকা। এই ফুলের অনেকগুলো প্রজাতি। গ্রিক শব্দ ক্রিসন অর্থাৎ সোনা এবং থিমাম অর্থাৎ ফুল থেকে এই নাম। দু’ধরনের চন্দ্রমল্লিকা হয়, ছোট এবং বড়। নানারকম রং হয় চন্দ্রমল্লিকার।

আরও পড়ুন-শুরু বইমেলা, চলবে উত্তরবঙ্গ পরিবহণের অতিরিক্ত বাস

চন্দ্রমল্লিকার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-অস্টিওপোরোটিক উপাদান। আর রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, রাইবোফ্লোভিন, নিয়াসিন, কোলিন। এই ফুলের নির্যাস ও তেল ত্বক, চুল, শরীরের জন্য খুব কার্যকরী দাওয়াই।
চোখের লালচে ভাব বা ঠান্ডা লাগার সংক্রমণজনিত ফোলাভাব থাকলে এই ফুলের রসে খুব উপকার পাওয়া যায়। তুলোয় করে এই ফুলের রস নিয়ে চোখের চারপাশে মাখলে একটু এই লালচে ভাব চলে যাবে।
চন্দ্রমল্লিকার ফুলের রস হৃদরোগ প্রতিরোধে খুব কার্যকরী। এই ফুলের রস ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে। ক্রিসেনথিমামে থাকা ভিটামিন এ এবং সি, মিনারেলস, উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ইমিউনিটি বুস্ট করে। উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
মাড়ি ফুলে গেলে বা মুখের ভিতর কোনও ঘা হলে চন্দ্রমল্লিকার রস খুব কার্যকরী।

আরও পড়ুন-আজ থেকে ফিরবে শীত

চন্দ্রমল্লিকার নির্যাস প্রাকৃতিক অ্যাস্ট্রিনজেন্ট। মুখের রোমকূপ সংকুচিত রাখে, অ্যাকনে দূর করে। চন্দ্রমল্লিকা-তেল তৈলাক্ত ত্বকের জন্য খুব উপযোগী।
চন্দ্রমল্লিকার তেল আন্ডা আই-এর জন্য খুব কার্যকরী। এই তেলে রয়েছে ভিটামিন এ, যা ড্রাই-ড্যামেজ ত্বকের কোষ রিমুভ করে, টক্সিন দূর করে।
এই ফুলের প্রদাহনাশক উপাদান তাই চন্দ্রমল্লিকার তেল ত্বকে একটা সুদিং এফেক্ট দেয়। সানবার্ন প্রতিরোধ করে।
চন্দ্রমল্লিকাতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, যা ভিটামিন এ সরবরাহ করে ফলে এই ফুল দিয়ে তৈরি যে কোনও স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ত্বকের জন্য দারুণ উপযোগী।
ক্রিসেনথিমাম টি নিয়মিত পান করলে ত্বক আর চুলের ক্ষেত্রে দারুণ ফল দেয়। ত্বক, চুলের রিজুভিনেশনে অনবদ্য এই চা।
চন্দ্রমল্লিকার নির্যাস হেয়ার ফলিকলকে রিভাইটালাইজ করে। ফলে নতুন চুল গজায়। এই ফুলের নির্যাসের জল দিয়ে চুল নিয়মিত ধুলে খুব ভাল কন্ডিশনারের কাজ করে।

Latest article