২০২৪-এর নির্বাচন কাউন্ট ডাউন শুরু

ফেসবুক আর দ্বেষভরা বুকের ভরসায় বাংলা জয়ের খোয়াব দেখছে ভারতীয় জঞ্জাল পার্টি। আগামী সাধারণ নির্বাচনে ওদের পরাস্ত করুন। লিখছেন অনির্বাণ ধর

Must read

২০২৪ এর ভোট দরজায় কড়া নাড়ছে। আর সেটা ভারতীয় জঞ্জাল পার্টির উদ্যোগ আয়োজন দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।
ব্যাপারটি ঠিক কীরকম, সবিস্তারে ব্যাখ্যা করা যাক। প্রথমেই দেখা যাক, বিজেপি কীভাবে সমাজ মাধ্যমে প্রভাব ছড়িয়ে, তাদের দক্ষিণপন্থী অর্থনীতির হাতে সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে যারা, তাদেরকেই পদ্ম মার্কা দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমর্থক করতে উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ, জঞ্জাল পার্টি জানে, যাদের আর্থিক বিপন্নতা সব সময় তাদের আইকিউকে চেপে রাখে, তাদের মনের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় আদিম রিপুর রাজনীতি। বিজেপির এই রকম লোকই দরকার, যারা বিশ্বাস করবে, মুসলিমরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে হিন্দুদের সব অধিকার কেড়ে নেবে। এই রকম লোককেই বিজেপির চাই, ভয় দেখালেই যারা প্রবল ভয় পেয়ে যায়। আর এরকম লোকের জন্য ফেসবুক দরকার বিজেপির।

আরও পড়ুন-মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত শেষের পথে নির্মাণকাজ, শেষ পর্যায়ের কাজ দেখতে মন্ত্রী

ভারতে ফেসবুক চালু হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। তার আগে ১৫ জুলাই আত্মপ্রকাশ করেছিল ট্যুইটার। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নরেন্দ্র মোদি যখন ট্যুইটারে অ্যাকাউন্ট খোলেন তখন তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। সেই বছর দেশের মাত্র ২০টি বড় শহরে সামান্য প্রভাব ছিল ফেসবুক, ট্যুইটারের। কিন্তু ২০১৪ সালে নির্বাচনী প্রচারের গোটা পরিসরই সোশ্যাল মিডিয়া দখল করে নিয়েছিল। প্রচারের ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই দাপট দেখে রাহুল গান্ধী ট্যুইটারে অ্যাকাউন্ট খোলেন ২০১৫-র এপ্রিলে।

আরও পড়ুন-কৃষকবন্ধু সহায়তা প্রদান বারাসতে

লক্ষ্য করুন, গেরুয়া শিবিরের সোশ্যাল মিডিয়া দখল কিন্তু এক বছরে হয়নি। ২০০৭ সালেই আইআইটি আমেদাবাদের গ্র্যাজুয়েট প্রদ্যোৎ বরার নেতৃত্বে আইটি সেল চালু করেছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে ২০১৫ সালে গেরুয়া শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যান প্রদ্যোৎ। বাজপেয়ী আমলের নেতা প্রদ্যোৎ বরা পরে স্বীকার করেছিলেন, কীভাবে ভোটে জেতার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে ভুয়ো প্রচারের কাজে ব্যবহার করেছিল বিজেপি। প্রদ্যোৎ বলেছিলেন, ‘‘সত্যের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রক্রিয়া বিজেপিতে শুরু হয় ২০১৪ সালে। সেবার নির্বাচনী প্রচারে ছড়ানো হয়েছিল বিভ্রান্তিকর তথ্য। নরেন্দ্র মোদি’ নামক অতিমানবীয় সত্তার নির্মাণ, অথবা আশি শতাংশ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশে ‘হিন্দুরা বিপন্ন’ নামক সম্পূর্ণ অলীক একটি ধারণাকে বহুজনবিশ্বাস্য করে তোলা— একবিংশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল ফেসবুক। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই মাধ্যমগুলিকে কাজে লাগানোর জন্য বিজেপির সঙ্গে ডিজিটাল মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী পুঁজিপতিদের মধ্যে একটা অঘোষিত জোট তৈরি হয়েছিল। এই জোটই তাদের প্রচারকৌশলে মোদি মিথ তৈরি করে বিজেপিকে এককভাবে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন-ডিমের জোগান বাড়াতে প্রশিক্ষণ

আমেরিকায় ‘সাইবার সিকিওরিটি ফর ডেমোক্র্যাসি’ নামে একটা সংগঠন একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। ফেসবুকের বিভিন্ন পেজকে ওরা পাঁচ ভাগে ভেঙেছিল— অতি-দক্ষিণপন্থী, দক্ষিণপন্থী, মধ্যপন্থী, বামপন্থী এবং অতি-বামপন্থী। পাঁচ মাস ধরে আশি লক্ষ পোস্টের পরিসংখ্যান বিচার করে জানা গেল যে, অতি-দক্ষিণপন্থী পেজের ভুয়ো খবরে সবচেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট হয়। পেজের প্রতি এক হাজার ফলোয়ারপিছু গড়ে ৪২৫ জন তেমন পোস্ট লাইক করেন, তাতে কমেন্ট করেন, শেয়ার করেন। আর মধ্যপন্থী পেজ থেকে যথাযথ তথ্য শেয়ার করলে প্রতি হাজার ফলোয়ারে এনগেজমেন্ট ৮০, বামপন্থী পেজে ১০০, অতি-বামপন্থী পেজে ১৪৫। শুনলে অবাক হতে হয়, মানুষের এই মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী ফায়দা তুলছে বিজেপি। ওদের নিজস্ব হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ ২ থেকে ৩ লক্ষ ।

আরও পড়ুন-চন্দ্রকোনায় তৃণমূলের প্রতিবাদসভায় জনসমুদ্র, সরব মন্ত্রী, নেতা

‘দ্য পলিটিসাইজেশন অব সোশ্যাল মিডিয়া ইন ইন্ডিয়া’‌ প্রবন্ধে জেলভিন জোসে লিখেছেন, বিজেপি গোপনে পরিচালনা করে ১৮ হাজার ভুয়ো ট্যুইটার হ্যান্ডেল। ফেসবুকের প্রাক্তন ডেটা সায়েন্টিস্ট সোফি ঝ্যাং তথ্যপ্রমাণ সহযোগে জানিয়েছিলেন, ভারতে ফেক অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাটি বিজেপির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। বিজেপির আইটি সেলের কর্তা ও প্রাক্তন আইবিএম কর্মী বিনীত গোয়েঙ্কা বলেছিলেন, ২০১৩ সালে যখন লোকসভা ভোটের প্রচার পর্ব শুরু হতে চলেছে তখনই বিজেপির নেটওয়ার্কের সদস্য সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার। তারাই জোরকদমে ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ ও ট্যুইটারে মোদি ও বিজেপির হয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিল গোটা দেশের সব শহর ও গ্রামীণ ব্লকে। শুধু দেশের মধ্যে নয়, আমেরিকায় এনআরআইদের মধ্যেও বিজেপি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। যাদের কাজ, শুধুই মোদির প্রচার করা। বিনীত গোয়েঙ্কার মন্তব্য, এদেশে ফেসবুক বিজেপিকে চেনায়নি, বিজেপিই ফেসবুককে চিনিয়েছিল।

আরও পড়ুন-নৌসেনায় অফিসার থেকে নাবিক, অসংখ্য পদ ফাঁকা, সংসদে স্বীকার কেন্দ্রের

এরপর আসা যাক বিজেপির নড়াচড়ার কথায়—
ভোটের কড়া নাড়া শুরু হতেই দিল্লি থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু হয়েছে। এ-রাজ্যে বামফ্রন্টকে ২০১১ সালে গদিচ্যুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তার আগের অন্তত দু’দশক এ-রাজ্যের রাজনীতি মানুষের আবেগ আন্দোলিত হয়েছে তাঁকে ঘিরেই। তারই ক্লাইম্যাক্স আমরা দেখেছি, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। দেখেছি, ব্রিগেডে বামফ্রন্টের ‘মৃত্যুঘণ্টা’ বাজানোর মধ্যে। সমাবেশের উপর গুলি চালিয়ে ১১ জনের প্রাণ নিয়েছিল বামফ্রন্টের পুলিশ। উত্তাল হয়েছে রাজ্য। কিন্তু পালাবদলের জন্য তারপরও অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৮ বছর! আর এখন বিজেপি নেতারা ভাবেন কী? বাড়িতে বাড়িতে ইডি লেলিয়ে দিলেই উপর থেকে ফানুসের মতো পরিবর্তন নেমে আসবে রামধনু পাখনা মেলে! সেজন্য বিজেপির পরিযায়ী পাখিদের ওড়াউড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে। একুশ সালের শুধু ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে এরাজ্যে ৩৮টি জনসভা করেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ করেন ২১টি। উলটে বেশ কয়েকবার আসব আসব বলেও শেষ মুহূর্তে অজ্ঞাত কারণে শাহর বঙ্গ সফর বাতিল হয়ে যায়। ২৯ নভেম্বর ধর্মতলার সভার আগে অমিতজি এসেছিলেন ১৬ অক্টোবর। এক দলীয় নেতার দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে। রামমন্দিরের আদলে প্যান্ডেলের ফিতে কাটতে। কোনও সাংগঠনিক বৈঠকে নয়। এমনকী, তার আগে ইস্টার্ন জোনাল কাউন্সিলের বৈঠকে তাঁর আসার কথা থাকলেও তা শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়। অবশ্য দলের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা গিয়েছে। কিন্তু তা নিয়েও তেমন কোনও সাড়া লক্ষ করা যায়নি।
সুতরাং আচমকা যাতায়াতে স্পষ্ট, ভোট এসে গিয়েছে।
এদের থেকে সতর্ক থাকার সময় সমুপস্থিত।

Latest article