চিকেন-ফুচকার অভিনব স্বাদ পাবেন ফুচকা গ্রামে

ফুচকার স্বাদ তো নিচ্ছেন বেশ তারিয়ে তারিয়ে। কিন্তু জানেন কি একটা গোটা গ্রামের বেঁচে থাকার রসদ এই ফুচকা? আসুন চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়–এর সঙ্গে ঘুরে আসি সেই গ্রামে। জেনে নিই তাঁদের লড়াইয়ের নেপথ্যকাহিনি

Must read

বাঙালি জাতির কথা মনে এলেই প্রথমেই যা মনে পড়ে তা হল মিষ্টি। মিষ্টি বাঙালিদের জনপ্রিয় হলেও টক-ঝাল খাবারও বিশেষ প্রিয় বাঙালির। আর তা যদি ফুচকা হয়, তাহলে বাঙালির জিভের যেন আর তর সয় না। সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত্রি— বাঙালির পাতে ফুচকা পড়লেই তাঁদের মুখে দেখতে পাবেন একগাল হাসি। সমগ্র বাঙালি ফুচকা এতই ভালবাসেন যে, ফুচকার নামে নাকি গ্রামের নামকরণ হয়েছে ‘ফুচকা গ্রাম’।
নিশ্চয়ই ভাবছেন এমন আবার হয় নাকি? বিশ্বাস করুন, হয়। ফুচকা গ্রাম কাঁচড়াপাড়ায় অবস্থিত।

আরও পড়ুন-মুর্শিদাবাদে ভ্রাম্যমাণ ট্রাফিক আদালত

কাঁচড়াপাড়ার শহিদ পল্লিতে প্রায় প্রত্যেক ঘরে ফুচকা তৈরি হয় বলে এই গ্রাম ফুচকা গ্রাম বলেও পরিচিত লোকের কাছে। এই গ্রামের প্রায় ১০০টি ঘরে তৈরি হয় ফুচকা। ফুচকা তৈরি এই গ্রামের মানুষদের প্রধান রুটিরুজি। দই-ফুচকা, জল-ফুচকা ও চাটনি-ফুচকা ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় চকোলেট-ফুচকা এবং চিকেন-ফুচকা। এই ফুচকা গ্রামের ফুচকার বিশেষত্ব হল, কলকাতা শহরে যেখানে ১০ টাকায় ৫টা ফুচকা পাওয়া যায় সেখানে এই গ্রামে ১০ টাকায় ৮টা কিংবা ১৪টা ফুচকা পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। যদি আপনি ফুচকা তৈরি দেখার অভিজ্ঞতা করতে চান তাহলে আপনাকে আসতে হবে এই শহিদপল্লি গ্রামে।

আরও পড়ুন-জাতীয় ফুটবল দলে আদিবাসী পাপিয়া

ফুচকা খেতে ভীষণ ভালবাসেন? তাহলে আপনাকে নিয়ে যাওয়া যাক এমন এক গ্রামে যেখানে দিনরাত ফুচকার গন্ধে ম-ম। যেদিকে তাকাবেন কেবল ফুচকার দোকান। সে-গ্রামের সবাই ফুচকা বানান। চিকেন-ফুচকা, মাটন-ফুচকা, দই-ফুচকা, ভুট্টা-ফুচকা, ঘুগনি-ফুচকা— কী নেই!
উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া এবং নদিয়া কল্যাণীর রথতলা সীমান্তেই সেই গ্রাম, শহিদপল্লি মাঝের চর এলাকায়। বাংলার সবথেকে বড় ফুচকাশিল্প সেই গ্রামেই।
সকাল হলেই ফুচকা তৈরির কাজে লেগে পড়েন সকলে। আটা, ময়দা, সুজি, চালের গুঁড়ো— এইসব দিয়ে মণ্ড প্রস্তুত করে সেগুলো ছোট ছোট রুটির আকারে বেলে নেওয়া হয়। তারপর হালকা করে শুকিয়ে কাঠের জালে ভাজা হয়। কেউ বা কয়লার আঁচেও ফুচকা ভাজেন। তারপর মুচমুচে বল তৈরির জন্য সেগুলোকে রোদে ফেলে রাখা হয়। সেই সঙ্গে চলে সুস্বাদু মশলা তৈরির কাজ। পাকা তেঁতুলগোলা, গন্ধরাজ লেবু দিয়ে টকজল বানিয়ে ফুচকার পেট ফাঁসিয়ে পরিবেশন করা হয় এরপরই।

আরও পড়ুন-চিন থেকে সরল এশিয়ান কাপ

দুপুর দুটোর পর ফুচকাগ্রামের বাসিন্দারা পশরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষ যে ভিড় করেন ফুচকার টানে! তাঁদেরই রসনা তৃপ্ত করে চলেন ওঁরা। দামও বেশ কম, কেউ দশ টাকায় দশটা ফুচকা দেন তো কেউ আবার পনেরোটাও! শহিদপল্লির ফুচকা বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি হয়। গ্রামের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে কলকাতা-হাওড়া, হুগলি, কল্যাণীর বাজারেও চলে আসে সেসব সুস্বাদু ফুচকা। আর বিয়ে বাড়ি কিংবা পুজো-পার্বণের অর্ডার এলে তো কথাই নেই, বেশি বেশি ফুচকা উৎপাদনের ধুম পড়ে যায় গ্রামে।
গত দু বছর ধরে করোনার রোষে যদিও ফুচকাশিল্পে ব্যাপক মন্দা এসেছে। অনেকে বিকল্প রুটি-রুজির খোঁজে চলে যান। তবে আবার ঘুরে দাঁড়ায় ফুচকা গ্রাম। আসলে সে গ্রামে ফুচকা বিক্রিই যে ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ফুচকা বিক্রি করতে শুরু করেছেন, ব্যবসায় অভিনবত্ব এনে তাঁরা অনলাইন মার্কেটিংয়ের সাহায্য নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন-চক্ষু চড়কগাছ কাটোয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, ভুয়ো বিলে পুকুরচুরি

সন্ধে হলেই বাঙালির মুখরোচক খাবারের মধ্যে চপ, শিঙাড়া, ঝালমুড়ি, ছাড়াও বিশেষ মুখরোচক ফুচকা। স্ট্রিট ফুডের জয়জয়াকার এখন সারা দেশ থেকে রাজ্যের সর্বত্র। এই ফুচকা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হরেক রকমের নামেই পরিচিত। যেমন গোলগাপ্পা, চটপটি। তবে এই বাংলার ফুচকার উপকরণ অনুসরণ করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হচ্ছে এই ফুচকা।
কাঁচড়াপাড়ার শহিদ কলোনির এলাকার বাসিন্দারা এই ফুচকা তৈরি করেই জীবন নির্বাহ করছেন দীর্ঘদিন। এলাকারই স্থানীয় প্রবীণ নাগরিক বলাই গাইন দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই ফুচকা তৈরি করেই সংসার চালাচ্ছেন। সেই থেকেই সূচনা কাঁচরাপাড়ার শহিদ কলোনির ফুচকা গ্রামের। কাঁচরাপাড়া শহিদ কলোনির এই এলাকা বিভিন্ন রকম ফুচকা তৈরি করে বিখ্যাত।
এই এলাকার ফুচকা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে এই এলাকায় মানুষ ফুচকা খেতে ছুটে আসেন। খুচরোর পাশাপাশি পাইকারি দরে ফুচকা বিক্রিও করে থাকেন। মানুষের চাহিদা মতোই তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রকমের ফুচকা। যেমন চিকেন-ফুচকা, চকোলেট-ফুচকা, দই-ফুচকা থেকে শুরু করে প্রায় ১২ থেকে ১৫ রকম ফুচকা তৈরি করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।

আরও পড়ুন-সুন্দরবনে বাঘের ডেরায় এবার কুমিরের হানা

করোনাকালে এই চাহিদা একটু কমলেও নিউ নর্মাল দিনে আবারও মানুষের চাহিদামতো বেড়ে চলেছে ফুচকা বিক্রি। কাঁচরাপাড়ার শহিদ কলোনির এই ফুচকাগ্রামের ইতিহাস অনেকেরই অজানা।
কাঁচরড়াপাড়া শহিদ কলোনির ফুচকাগ্রামের মানুষের কথায়, আগামী দিনে তারা এভাবেই তাদের জীবননির্বাহ করবে ফুচকা তৈরির মাধ্যমেই।
জিভে জল আনা ফুচকার স্বাদ নেয়নি এমন রসিক বাঙালি বোধহয় নেই। শুধু বাংলা নয়, ফুচকার স্বাদ সমানে আস্বাদন করেন ভিনরাজ্যের মানুষেরাও। সেটা যে কোনও অনুষ্ঠান হোক অথবা রাস্তার ধারে লাইন দিয়ে।

আরও পড়ুন-মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফরে প্রস্তুতিসভা

এমনই আরও এক ছবির দেখা গেল নদিয়ার রানাঘাট থানার অন্তর্গত পুলিননগর গ্রামে। সারা বাংলায় সব জেলাতে যত ফুচকা বিক্রি হয় তার সিংহভাগ ফুচকা সরবরাহ হয় নদিয়ার এই গ্রাম থেকেই। এই গ্রামের দুশোটি পরিবার এই ফুচকা তৈরি করার সঙ্গে জড়িত। এদের বংশপরম্পরায় এই ব্যবসা। এই দুশোটি পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ ফুচকা বানানো। কিন্তু প্রায় দু বছর ধরে চলা লকডাউনে পরিবারগুলির জীবনযাত্রা একদম বদলে গেছে। সারাদিনের চরম ব্যস্ততায় আজ শুধু শূন্যতা। অধিকাংশ কারখানায় ঝুলছে তালা। ফুচকার কারিগরের পরিবারের প্রত্যেকের মাথায় হাত। চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার আতঙ্ক। যা ছাপিয়ে গেছে করোনা আতঙ্ককেও।
ক্ষতির মুখে লকডাউনে ক্ষুদ্র-মাঝারি সব ব্যবসায়ী। লকডাউন উঠে গিয়েছে, হয়ত তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। ক্ষতি সামলে নিয়ে লাভের মুখ দেখবেন কয়েকমাস পর। কারণ তাঁরা হারিয়েছেন সময়। কিন্তু ফুচকার কারিগররা? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে ফেলেছেন অর্থ আর শ্রম।

আরও পড়ুন-জল পরীক্ষায় বাংলা দেশে প্রথম

কেমন আছেন ফুচকার কারিগররা? এটা জানতে যখন পুলিননগর গ্রামে পৌঁছানো গেল, তখন এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। পুলিননগর পৌঁছতেই দেখা যায়, রাস্তার ধারে লাইন দিয়ে পড়ে আছে লক্ষ লক্ষ ফুচকা। প্রথমে মনে হয়েছিল এইভাবে হয়ত ফুচকা শুকোতে দিয়েছে। গ্রামে ঢুকতেই বদলে গেল ছবিটা।
রাস্তার ধারে যে লক্ষ লক্ষ ফুচকা দেখা গিয়েছিল আসলে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে এই ফুচকাগুলো। এই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফুচকার কারিগর বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, ‘‘রাজ্যের অধিকাংশ জেলাতে এই পুলিননগর থেকে ফুচকা যায় । প্রচুর চাহিদা। সেইজন্য আমাদের মাল মজুত করে রাখতে হয়।


আর বিয়ে বা কোনও অনুষ্ঠানের সিজনে অতিরিক্ত মাল তৈরি করতে হয়। মার্চ-এপ্রিল বিয়ের সিজন। তাই প্রত্যেকের ঘরে সাধারণ সময়ের থেকে অতিরিক্ত মাল মজুত ছিল। লকডাউনের আগে প্রায় দু’মাস ধরে লাখ লাখ মাল প্যাকেট করা হয়েছে। সেইসব ফুচকা প্যাকেটবন্দি অবস্থায় আজও ঘরে পড়ে আছে।

আরও পড়ুন-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পাখা, আলো দান

ফুচকা তৈরির পর দশ দিনের বেশি রাখা যায় না। সেখানে প্রায় দেড় মাস ধরে ব্যবসা বন্ধ। যারা মাল নেয় তারা কেউ মাল নেয়নি। যার ফলে লাখ লাখ ফুচকা রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছে। শুধু রাস্তায় নয়, লাখ লাখ ফুচকা ফেলা হয়েছে নদীতেও। দাদা এমনিতেই খাবারের পয়সা নেই। তাই গাড়ি ভাড়া করে ফুচকা নদীতে নিয়ে ফেলে আসা সম্ভব হয়নি। জানি এলাকা নোংরা হয়েছে। কিন্তু কোনও উপায় নেই আমাদের।”
এই লকডাউনের দুশোটি পরিবারের গড়ে লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয়েছে। শ্রম আর অর্থ দুটোই চলে যাওয়াতে দুশোটি পরিবারের সামনে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এলাকার এক গৃহবধূ আন্না বিশ্বাস। তাঁর স্বামী ফুচকার কারিগর। এই ক্ষতির মুখে পড়ে গৃহবধূর স্বামী মানসিক এতটাই বিপর্যস্ত যে কথা বলার শক্তি তার ছিল না। তাই আন্না বিশ্বাস বলেন, ‘‘আমাদের এই গ্রামে দুশোটি পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এটা একমাত্র রোজগারের পথ। পুঁজি বলতে আর কিছু নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। লকডাউন উঠে গেলেও ব্যবসা করার মতো আর পুঁজি নেই। পরিবার নিয়ে না খেতে পেয়ে মরে যাব।” আর কথা বলতে পারলেন না আন্না বিশ্বাস। কান্নায় তার গলা জড়িয়ে আসে।

আরও পড়ুন-বিধানসভা নির্বাচনের এক বছর আগেই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা বিপ্লব দেবের, কী বলছে তৃণমূল

প্রায় বছর দুয়েক ধরে বন্ধ দুশোটি পরিবারের ব্যবসা। তাদের এখন বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে রাজ্যের দেওয়া রেশন। তাই পুলিননগরের দুশোটি পরিবারের আর্জি, তারা জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কী? সরকার যদি মানবিকতার সঙ্গে এই দুশোটি পরিবারের কথা চিন্তা করে তাহলে তারা পরিবারের নিয়ে বাঁচতে পারবে। সেই আশায় বুক বেঁধে দিন গুনছেন রানাঘাটের পুলিননগর গ্রামে বিশ্বজিৎ, আন্নারা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশ জুড়ে তালা পড়বে সেটাই বা ভেবেছিল কে? তাই নিত্য যেমন তৈরি করেন, লকডাউনের আগে সেভাবেই আটা চেলে তাতে সুজি, খাবার সোডা, মিশিয়ে গুলি পাকিয়ে তেলে ভাজার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন। বাকি ছিল শুধু পেট ফুটো করে টক জল আর আলু-মটর পুরে মুখে ফেলার পালা। সেটা আর হল কই? তাই প্যাকেটবন্দি হয়ে এখন গড়াগড়ি খাচ্ছে লাখ লাখ ফুচকা।
কলকাতা, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, এই সমস্ত জায়গায় যত ফুচকা বিক্রি হয় তার সিংহভাগই রানাঘাটের এই পুলিননগর গ্রামের কারিগরদের তৈরি। দেশ জুড়ে যখন লকডাউন, তখন অত্যাবশকীয় পণ্য ছাড়া বাকি সবকিছুর আদানপ্রদানই বন্ধ ছিল। তাই পুলিননগর থেকে ফুচকাও আর যায় নি কোনও জায়গায়।

আরও পড়ুন-একদিকে কাশ্মীর ফাইলস অন্যদিকে খুন পণ্ডিতরা, মোদি–শাহর বিরুদ্ধে ক্ষোভে উত্তাল জনতা

তাদের তৈরি হরেকরকম ফুচকাতে আছে বিশেষত্বও। ফুচকা গ্রামের ফুচকার বিশেষত্ব হল কলকাতা শহরে যেখানে ১০ টাকায় ৫টা ফুচকা পাওয়া যায় সেখানে এই গ্রামে ১০ টাকায় ১৫টা কিংবা ১৪টা ফুচকা পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে।
লকডাউন উঠে গেলেও তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ক্ষতি সামলে নিয়ে লাভের মুখ দেখার চেষ্টা করছেন। কারণ তাঁরা হারিয়েছেন সময়।
ফুচকার কারিগররা প্রথমে মুখ খুলতে চাননি। সেটা তাঁদের জীবনযন্ত্রণা থেকে হয়তো। অনেক পীড়াপীড়ির পর শ্যামল মণ্ডল বলেন, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, রাজ্যের অধিকাংশ জেলাতে এই পুলিননগর থেকে ফুচকা যায়। প্রচুর চাহিদা। সেই জন্য আমাদের মাল মজুত করে রাখতে হয়। আর বিয়ে বা কোনও অনুষ্ঠানের সিজনে অতিরিক্ত মাল তৈরি করতে হয়। মার্চ এপ্রিল বিয়ের সিজন। তাই প্রত্যেকের ঘরে সাধারণ সময়ের থেকে অতিরিক্ত মাল মজুত ছিল। লকডাউনের আগে প্রায় দু’মাস ধরে লাখ লাখ মাল প্যাকেট করা হয়েছে। সেইসব ফুচকা প্যাকেট বন্দি অবস্থায় ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে।

আরও পড়ুন-বিজেপি-সিপিএম চায় বাংলাকে অশান্ত করতে

কীভাবে তৈরি করেন ফুচকা, যা অন্যদের থেকে আলাদা? সেটাও প্রথমে বলতে চাননি। তারপর যা বললেন, তা হুবহু তুলে ধরছি। ফুচকা তৈরি করতে প্রচুর টাকার পুঁজি লাগে। তাই লকডাউনের সময় ফুচকা কারিগরদের মূলধন আর শ্রম দুটোই রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়েছে। এই লকডাউনে দুশোটি পরিবারের গড়ে লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয়েছে। শ্রম আর অর্থ দুটোই চলে যাওয়াতে দুশোটি পরিবারের সামনে বর্তমানে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এলাকার এক গৃহবধূ চামেলি কর্মকারের স্বামী ফুচকার কারিগর। এই ক্ষতির মুখে পড়ে গৃহবধূর স্বামী মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন যে কথা বলার শক্তি তার ছিল না। তাই তিনি বলেন, ‘‘আমাদের এই গ্রামে দুশোটি পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এটা একমাত্র রোজগারের পথ। পুঁজি বলতে আর কিছু নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। লকডাউন উঠে গেলেও ব্যবসা করার মতো আর পুঁজি নেই। পরিবার নিয়ে না খেতে পেয়ে মরে যাব।” তাঁদের এখন বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে পরিবার প্রতি সরকারের দেওয়া চাল আর আটা। সরকারের এই অনুদান কতদিন চলবে, এটা ভেবেই চোখে অন্ধকার দেখছেন পুলিননগরের দুশোটি পরিবার। তাঁদের আর্জি, তারা জানেন না তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? সরকার যদি মানবিকতার সঙ্গে এই দুশোটি পরিবারের কথা চিন্তা করে তাহলে তাঁরা পরিবারের নিয়ে বাঁচতে পারবেন। সেই আশায় বুক বেঁধে দিন গুনছেন রানাঘাটের পুলিননগর গ্রামের বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন-গোয়েন্দা-জালে প্রতারণার কিংপিন

এঁদেরই একজনের সঙ্গে আলাপ জমালাম। জানার চেষ্টা করলাম তাদের জীবন যন্ত্রণার কথা। বয়স প্রায় ষাটের ঘরে। পোড়খাওয়া মানুষটি যা বললেন তা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। তিনি বলেন, দেশজুড়ে লকডাউন। অত্যাবশকীয় পণ্য ছাড়া বাকি সবকিছুর আদানপ্রদানই বন্ধ। তাই পুলিননগর থেকে ফুচকাও তখন আর যায় না কোনও জায়গায়। হতাশায় কারিগরদের কেউ রাস্তার ধারে ফেলে দিয়েছেন ফুচকার বস্তা। কেউ ভাসিয়ে দিয়েছেন নদীতে। দেশজুড়ে তালা পড়বে সেটাই বা ভেবেছিল কে? তাই নিত্য যেমন তৈরি করেন, সেভাবেই লকডাউনের আগে আটা চেলে তাতে সুজি, খাবার সোডা, মিশিয়ে গুলি পাকিয়ে তেলে ভাজার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন। বাকি ছিল শুধু পেট ফুটো করে টক জল আর আলু-মটর পুরে মুখে ফেলার পালা। সেটা আর হল কই?

Latest article